ক্ষমতায় থাকতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণের গলা চেপে ধরেছিলো হাসিনা সরকার। এদিকে দ্রব্যমূল্যের জন্য সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস অন্যদিকে মেগা সব প্রকল্প দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করে বাদশাহী জীবন যাপন করছিলেন হাসিনাসহ তার মন্ত্রী, এমপি, সচিব, আমলা ও তার দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীরা। এর বাইরে ভারতকে একপ্রকার আমাদের প্রভু মানতে বাধ্য করা হচ্ছিলো। এই সুযোগে ভারতের আধিপত্য দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছিল। এর মধ্যেই গত বছরের জুলাইয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে সরব হন ঢাবির শিক্ষার্থীরা। পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। দমনপীড়নের অভ্যস্ত হাসিনা সরকার শিক্ষার্থীদের প্রতি নমনীয় আচরণের পরিবর্তে আবারও দমনপীড়নে উদ্যত হয়। ছাত্রলীগ এবং পুলিশের একের পর শিক্ষার্থীদের ন্যাক্কারজনকভাবে হামলা চালাতে শুরু করে। যেখানে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সেখানেই ছাত্রলীগ আর পুলিশের হামলা যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার দেয়া ‘রাজাকারের বাচ্চা’ উপাধি আর রংপুরে পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দেয়া আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার দৃশ্য প্রতিটি শিক্ষার্থীর রক্তে যেন আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর একে একে প্রায় সব জেলাতেই আন্দোলন তুঙ্গে উঠতে শুরু করে। বিপরীত দিকে হাসিনা সরকারের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধ অবস্থান আর তাদের গুলিতে শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষদের মৃত্যু গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ৫ আগস্ট হাসিনার ভারত পালিয়ে যাওয়ার দিন পর্যন্ত এই গণঅভ্যুত্থানে পুরো বাংলাদেশে সরকারি হিসেব অনুযায়ী ১৪০০ ছাত্রজনতা মৃত্যু বরণ করেছেন। আহত হয়েছে কয়েক হাজার। তবে গত ১৩ এপ্রিল ২০২৫ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ৮৬৪জনকে এবং আহত ১৪ হাজার ব্যক্তি শনাক্ত করা হয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়। ঢাকার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম এসব তথ্য জানান। সংবাদ সম্মেলনে তিনি উল্লেখ করেন ভেরিফাই এখনও সম্পন্ন হয়নি। এটা চলমান রয়েছে।
১৪ হাজার শনাক্তের মধ্যে বগুড়ার আহত রয়েছেন ৫৪৩ জন। এই আহতরা কেমন আছেন? তারা আন্দোলনে কিভাবে এলেন, কীভাবে আহত হলেন এবং তাদের প্রত্যাশা কি ছিলো এবং কি হলো, কয়েকজন আহতের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করা হয়েছে। আহতরা যা বলেছেন সেটা এখানে তুলে ধরা হলো।

“পা হারিয়ে থমকে গেছে জুলাই যোদ্ধা রতনের সংসার জীবন”
গত জুলাই আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে পা হারিয়েছেন সারিয়াকান্দির জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধা শফিকুল ইসলাম রতন। বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, দুই মেয়েকে নিয়ে সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির পা হারানোয় থমকে গেছে তার পরিবারের উপার্জন। এই শফিকুল ইসলাম রতন বগুড়া সারিয়াকান্দি উপজেলার পৌর এলাকার ধাপ গ্রামের মৃত ইলিয়াস উদ্দিন আকন্দের ছেলে। গত তিনবার যমুনা গর্ভে জমি জমা, ভিটে মাটি হারিয়ে গাজীপুরে গিয়ে অটোরিকশা রিক্সা চালিয়ে সংসার চালাতেন।
১৬ জুলাই সকালে শহীদ আবু সাঈদ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার পর সারাদেশে যখন আন্দোলন বেগবান হয়, ঠিক সেদিন বিকালে মিছিলে যোগ দেন শফিকুল ইসলাম রতন। বিকাল সাড়ে ৪ টার দিকে গাজীপুর শফিপুর এলাকায় যখন মিছিল বের করা হয় তখন পুলিশ মিছিলে গুলি চালায়। সে দিন পুলিশের গুলি মাথায় লেগে একজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। এরপর পুলিশের গুলি থেকে বাঁচতে সবার সাথে অটো চালক শফিকুল ইসলাম রতনও দিগ্বিদিক দৌড় দেন। পুলিশ পিছন থেকে গুলি করে। ফলে একটি গুলি রতনের ডান পায়ে বিদ্ধ হয়। গুলি বিদ্ধ অবস্থায় পা নিয়ে দৌড়ানোর ফলে রাস্তার পার্শ্বে থাকা একটি লোহার এঙ্গেলও তার ডান হাতে ঢুকে যায়। তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নেয়া হয়। পঙ্গু হাসপাতালে সুস্থ হলে তাকে সারিয়াকান্দি গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। কিছুদিন পরে পুনরায় অসুস্থতা অনুভব করলে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার পায়ে ইনফেকশন ছড়িয়ে পরে। পরে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী তার ডান পা কেটে ফেলতে বাধ্য হয়। জীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যান জুলাই যোদ্ধা শফিকুল ইসলাম রতন। এর পর ঢাকায় ব্রাক ব্যাংকের সহায়তায় তিনি একটি কৃত্রিম পা পেয়েছেন। গত ২৭ সে রমজান ১ লক্ষ টাকাও পেয়েছেন তিনি। তবে চিকিৎসা ও সংসার ভরণপোষণে জন্য ইতোমধ্যেই পুরো টাকা খরচ হয়েছে। বড় মেয়ে সুস্মিতা আক্তার বগুড়া সৈয়দ আহম্মেদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের মনোবিজ্ঞান বিষয়ের অনার্স ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী।
তার ছোট মেয়ে মরিয়ম আক্তার সারিয়াকান্দি পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭ম শ্রেণিতে পরে। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পা হারিয়ে এখন দিশেহারা হয়ে পরেছেন। নিজের পরিবারের ভরণপোষণ চালাতে তিনি তার বড় মেয়ের সুস্মিতার জন্য সরকারের কাছে একটি চাকরি দাবি করছেন। দেশের মানুষ ভালো থাকলেই পা হারানো সার্থক হবে বলে শফিকুল ইসলাম রতন মনে করেন।

“হাসিনার পতন না হলে আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত ছিলো”- সামিন ইয়াসার আভাস
জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং স্বৈরাচার সরকারের পতনের আন্দোলনে গিয়ে পুলিশের লাঠিচার্জ ও ছররা গুলিতে আহত হয়েছিলেন বগুড়া শহরের চকফরিদ কলোনি এলাকার সামিন ইয়াসার আভাস। টিভিতে, ফেসবুকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের মারধর আর পুলিশের দমন পীড়নের চিত্র এবং আন্দোলনকারীদের রক্তাক্ত মুখ তাকে আন্দোলনে টেনে নিয়ে যায়। ১৬ জুলাই থেকেই তিনি কলেজের ইউনিফর্ম আর গলায় আইডি কার্ড ঝুলিয়ে তিনি কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে ঝাপিয়ে পড়েন।
আভাস বলছিলেন, জুলাই আন্দোলনে গিয়ে তিনি দুইদিন আহত হয়েছেন। প্রথমবার আহত হয়েছেন ১৬ জুলাই। সেদিনই বগুড়ায় কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দুপুর নাগাদ কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনায় শহরের সাতমাথা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
ঘটনার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আভাস বলেন, তিনি দুপুর পর্যন্ত পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের সামনে বন্ধু ও সহপাঠীদের সাথে আন্দোলন করছিলেন। পরে বিকাল সাড়ে ৪টায় তিনি সাতমাথায় চলা আন্দোলনে যোগ দেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত ব্যাপকভাবে আন্দোলন চলে সেদিন সাতমাথায়। সন্ধ্যা ৬টার দিকে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল ও গুলি ছুড়তে শুরু করে।
আভাস যোগ করেন-তিনি জানতেন পুলিশের ছোড়া গুলি থেকে আসল না নকল বুলেট বেরুচ্ছে। তাই তিনি কিছুটা ভয় পেয়ে যান। নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি বগুড়া জিলা স্কুলের সামনে আশ্রয় নেন। ওই সময়ই নাকি পুলিশ তার দিকে সরাসরি গুলি তাক করে তাকে জিলা স্কুলের ভেতরে ঢুকতে বলে। স্কুলে ঢোকার পর এরপর একজন, দুইজন করে প্রায় ৭-৮ জন পুলিশ তাকে মারতে থাকে। লাথি, চড় এবং লাঠি দিয়ে তাকে আঘাত করতে থাকে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত পুলিশ তাকে পেটায়।
এরপর দুই আগস্ট কলোনি এলাকায় দুপুর দেড়টা নাগাদ ছররা গুলির শিকার হন আভাস। তার হাতে ৬-৭টি ছররা বুলেট বিঁধে যায়। ঘটনার বিস্তারিত জানাতে গিয়ে আভাস উল্লেখ করেন, তারা একদল শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় লোকজন কলোনি এলাকায় আন্দোলন করছিলেন। পুলিশ তাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে দিতে সাউন্ড গ্রেনেড টিয়ারশেল ছোড়ে। এর মধ্যে সেখানে ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ প্রবেশ করে। পুলিশের গুলি আর ছাত্রলীগের ধাওয়ায় তারা পেছনে হটতে শুরু করেন। এর মধ্যে ছাত্রলীগের গ্রুপটি থেকে একজন তাদের দিকে লাঠি ছুড়ে মারে। লাঠির আঘাতে শাবাব নামে আভাসের এক বন্ধু মাটিতে পড়ে যায়। এ সময় শাবাবকে উঠাতে গেলে ছাত্রলীগের একজন তাদের দিকে ছররা গুলি ছোড়ে। ওই ছররা গুলি শাবাব আর আভাসের শরীরে গিয়ে লাগে। আভাসের হাতে এসে ৬-৭টি গুলি লাগে। তবে শাবাবের শরীরে বেশি গুলিবিদ্ধ হয়। ছররাগুলি ছাত্রলীগের ওই গ্রুপ থেকেই ফায়ার করা হয়েছে। হাসিনার পতন না হলে আমাদের মৃত্যু নিশ্চিত ছিলো।
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসা কোথায় কীভাবে করালেন জানতে চাইলে আভাস বলেন, তার এক আত্মীয় ওই সময় কলোনির হেলথসিটি ক্লিনিকে নিয়ে যান চিকিৎসার জন্য। সেখানেই তার চিকিৎসা করানো হয়। গুলি বের করার পর ওই দিনই তিনি আবারও আন্দোলন যোগ দেন। আভাস আরো বলেন, পরদিন ওই ক্লিনিকে পুলিশ গিয়ে কারা সেখানে চিকিৎসা নিয়েছে তাদের তথ্য নিয়েছে এবং আহত কাউকে আর চিকিৎসা যেন না দেয়া হয় কড়াভাবে এমন নির্দেশনা দেয়া হয়।
অনেকের ধারণা অন্তর্বর্তী সরকার আমাদের অনেক সাপোর্ট দিচ্ছে। নির্বাচিত সরকার আসলে আমরা আদৌ কি সেই সাপোর্ট পাবো? এমন অনেকের ধারণা আছে নির্বাচিত সরকার আসলে আমরা এরকম সাপোর্ট পাবো না। আবার পেলেও আল্লাহ না করুক, আওয়ামী লীগ যদি ব্যাক করে, তখন তো আহত, নিহতদের পরিবার এবং সমন্বয়করা তো সবচেয়ে বড় টার্গেট থাকবে। আমি মনে করি এইরকম ভয়ভীতি যারা পাচ্ছে তাদের এই ভয় কাটানো দরকার এবং তাদেরকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখা যায় এবং চিকিৎসার মধ্যে রাখা যায় সেই জিনিসটা দরকার। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, আমার এক পরিচিত ছোট ভাই আছে, যে মাথায় গুলি খেয়েছে। সে এখনও সরকার থেকে কোনো সহযোগিতা নেয়নি। আমি তাকে বলেছিলাম, সরকার থেকে তো এরকম সুবিধা দিচ্ছে তুমি নিচ্ছো না কেন? সে জানিয়েছে তার পরিবার থেকে নিষেধ করেছে।

“পুলিশের ছররা গুলি কেড়ে নিয়েছে গালিবের চোখ”
জুলাই আন্দোলনে আহত আরেক শিক্ষার্থী আসাদুল্লাহ হিল গালিব। তিনি চলতি বছর বগুড়া মোস্তাফাবিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষা দিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনে গিয়ে তিনি আজিজুল হক কলেজ সংলগ্ন কামারগাড়ী মোড় এলাকায় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের সময় পুলিশের ছররা তার ডান চোখ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। গালিব বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলা দেওতাগ্রামের ফেরদৌস রহমানের ছেলে। ঘটনার বিস্তারিত বলতে গিয়ে গালিব বলেন, হাসিনা সরকারের জুলুমের বিরুদ্ধে আবু সাঈদের বুক পেতে দেয়ার সাহস আর আন্দোলনকারীদের উপর নির্মম নিপীড়নের চিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেখে তিনিও নিজেকে ঘরে আটকে রাখতে পারেননি। তাই তার মাদ্রাসার সহপাঠী, বন্ধু এবং মেসের বড় ভাইদের সাথে সেও আন্দোলনে যোগ দেন তিনি। সেদিন ১৮ জুলাই ছিলো। ওইদিনই তার প্রথম আন্দোলনে যাওয়া। তাদের পরিকল্পনা ছিলো আজিজুল হক কলেজ থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে সাতমাথায় যাওয়া। পরিকল্পনা অনুযায়ী কলেজ থেকে বিক্ষোভ করতে করতে তারা এগোচ্ছিলেন। পথিমধ্যে কামারগাড়ি এলাকায় পৌঁছলে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ প্রথমে টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। এরপর ছররা গুলি ছুড়তে শুরু করে। ওই সময় ওই গুলি এসে তার চোখসহ শরীরে বিভিন্নস্থানে বিঁধে যায়।
আসাদুল্লাহ হিল গালিব বলেন, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে তার সহযোদ্ধারা চিকিৎসার জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ড্রেসিং, চোখে সেলাই আর আমার শরীরে বিঁধে যাওয়া কয়েকটি বুলেট বের করে দেন চিকিৎসক। তার শরীরে চোখসহ মোট ৬/৭টা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলো। এখনও একটা বুলেট তার শরীরে আছে। যেটি হাড় অবধি পৌঁছে গেছে।
গালিব বলেন, চোখের ভেতরে বিদ্ধ হওয়া গুলি চোখের অনেক গভীর পৌঁছে যাওয়ায় শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওই বুলেট বের করা সম্ভব না বলে জানিয়ে দেন চিকিৎসক। এরপর ওই হাসপাতালের ডাক্তারদের পরামর্শে ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। এর মধ্যে সেখানে যাওয়ার পর পুলিশ তার নাম পরিচয় নেয়ার পর তারা ভয় পেয়ে যান। মামলা হতে পারে এরকম দুশ্চিন্তা মাথায় আসে। এরপর তার সহযোদ্ধারা তাকে নিয়ে এক প্রকার হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। ১৮ তারিখেই তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকায় পৌঁছার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা তাদের অ্যাম্বুলেন্স আটকায়। পরে তারা যখন জানতে পারে আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত তখন তারাই অ্যাম্বুলেন্সটি গার্ড দিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশি অ্যাকশনের মধ্যে পড়ে আমাদের অ্যাম্বুলেন্স। টিয়ারসেল নিক্ষেপ ও গুলি ছুরতে থাকে পুলিশ। এরকম বাধা পেরিয়ে একসময় হারুন আই ক্লিনিকে তারা পৌঁছায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় তাকে। এরপর ভিশন আই হসপিটালে রেফার্ড করা হয়। সেখানেই তার চোখের অপারেশন হয়। তার চোখের ভেতর থেকে বুলেট বের করা হয়। ওই অপারেশনের পর আরও দুইটি চোখের অপারেশন হয়। অপারেশনের পর কিছুদিন চোখে ঝাপসা দেখতে পাচ্ছিলেন গালিব। তবে বর্তমানে তার ওই চোখ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে।

“আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধেও আন্দোলন করতে হয়েছে এটা দুঃখজনক”তৌহিদ হোসেন:
১৮ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন আন্দোলনে ছিলেন বগুড়ার বিয়াম স্কুলের শিক্ষার্থী তৌহিদ হোসেন কোটা সংস্কার আন্দোলনে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের নির্মম নিপীড়ন আর আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করার দৃশ্য দেখে তিনিও স্বেচ্ছায় আন্দোলনে যোগ দেন। আন্দোলনে গিয়ে তিনি গত ৪ আগস্ট পুলিশের ছোড়া ছররা এবং চাইনিজ বুলেটে আহত হন। তৌহিদ বগুড়ার উপশহর এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে।
তৌহিদ হোসেন বলেন, সেদিন দুপুরের দিকে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রথম তিনি শহরের সেলিম হোটেল সংলগ্ন এলাকায় পুলিশের সাথে সংঘের সময় পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হন। তার হাতে, বাম পায়ের উরুসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় বুলেটবিদ্ধ হয়। কিন্তু সেগুলোর ব্যথা শরীরে থাকলেও সহ্য করতে পারছিলেন। তাই তিনি আন্দোলনে থেকে যান। এরপর সাতমাথায় যান। বিকাল সাড়ে ৩ টার দিকে শহরের সাতমাথায় অবস্থিত বগুড়া কলেজের সামনে শেরপুর রোডে রাস্তায় ব্লক ফেরে ব্যারিকেড দিচ্ছিলেন। এ সময় তার একবন্ধু এবং আন্দোলনের আরেক সহযোদ্ধা ছিলেন। ব্যারিকেড দিতে গিয়ে তিনি হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখেন পুলিশ বন্দুক তাক করেছে তার দিকে। সেটা দেখে তিনি সামনের দিকে দৌড় দেন। এ সময় ওই পুলিশ গুলি করলে তার বাম পায়ের তালু গুলিবিদ্ধ হয়। এরপর তার সহযোদ্ধারা তাকে জিলা স্কুলের পেছনের গলি দিয়ে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের দিকে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে তার এক বন্ধুর সহযোগিতায় তিনি বগুড়ার মাটিডালিতে অবস্থিত হেলথ ভিলেজ ক্লিনিকে গিয়ে চিকিৎসা নেন।
তৌহিদ বলেন, ক্লিনিকের ডাক্তার তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। গুলিবিদ্ধ স্থানে ড্রেসিং করে দেন। কিন্তু তিনি গান পাউডার ঠিকমতো পরিষ্কার করতে পারেননি। তাই তার ক্ষতস্থানে ইনফেকশন হওয়ার পর্যায়ে গিয়েছিলো। এজন্য ২৬ আগস্ট বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে ভর্তি হতে হয়। সেখানকার চিকিৎসক তার পায়ের সার্জারি করে। সেখান থেকে রিলিজ দেয়ার পর কিছুদিন ভালো থাকলেও পায়ের সমস্যা বেড়ে যাওয়ায় অক্টোবরে আবার ভর্তি হতে হয় তাকে। এভাবে সমস্যার মধ্যেই তাকে দিন পার করছিলেন। তবে গত ৩ মাস হলো তিনি ঠিকঠাক মতো চলাফেরা করতে পারছেন।
তৌহিদ বলেন, হাসপাতালে যখন ভর্তি ছিলাম তখন শুধুমাত্র জামায়াতে ইসলামীর শহর আমির দেখা করতে এসেছিলেন। ৫০০০ টাকা দিয়েছিলো সে সময়। এছাড়া আর কোন রাজনৈতিক দল আমার সাথে সাক্ষাৎ করেনি। তবে সরকার থেকে ক্যাটাগরি অনুযায়ী যে অনুদান দেয়া হচ্ছে সেটি পেয়েছি।
তৌহিদ আরো বলেন, আওয়ামী লীগ যে নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ যে অপরাধগুলো করে গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিলো, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের উচিত ছিলো, ৫ আগস্টের পর থেকেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে আবারও আমাদেরকেই আন্দোলন করতে হলো। এটা দুঃখজনক। এছাড়া এরপর লাশ নিয়ে রাজনীতি, এনসিপি গঠন এগুলো কোনো কিছুই আমার ভালো লাগেনি।