• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৮ অপরাহ্ন

উত্তরের দরিদ্র জনপদের আশার আলো: শিক্ষাই হোক বদলের হাতিয়ার

সুদীপ্ত শামীম / ১৭৫ Time View
Update : শনিবার, ৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের উত্তরের প্রান্তে অবস্থিত গাইবান্ধা জেলা তার অনন্য ভূগোল ও নদীমাতৃত্বের কারণে বহু বছর ধরেই দারিদ্র্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং বিশেষ করে নদীভাঙনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, ও অন্যান্য নদীর প্রবল স্রোত বারবার গ্রামাঞ্চলের জমি, বসতঘর ও মানুষের স্বপ্ন ভেঙে দিচ্ছে। প্রতি বছর বন্যা ও দীর্ঘ সময় পানিবন্দি জীবন এখানকার মানুষের জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও গাইবান্ধার মানুষদের মধ্যে শিক্ষার প্রতি অটল বিশ্বাস ও উন্নয়নের গভীর আকাঙ্ক্ষা দেখা যায়। গ্রামের ছোট-বড় সবাই জানে, শুধুমাত্র শিক্ষা আর উন্নয়নই তাদের কষ্টের জীবন থেকে মুক্তি দিতে পারে। তাই শিশু-কিশোরেরা নানা ঝুঁকি আর কষ্ট সইয়ে, পায়ে হেঁটে কিংবা দূর পথ পাড়ি দিয়ে স্কুলে যায়। তারা জানে, এই শিক্ষা তাদের ভবিষ্যতের আলো। এই প্রত্যাশা আর অধ্যাবসায় গাইবান্ধাকে একটি আলোকবর্তিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে, যেখানে শত বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে মানুষের উন্নয়নের স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হচ্ছে। আজকের এই সংগ্রামী সমাজই আগামী দিনের উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের মূল চালিকা শক্তি।

প্রেক্ষাপট সমস্যা: দারিদ্র্য, দুর্যোগ আর অবহেলা
গাইবান্ধা জেলা শুধু নদীভাঙন ও বন্যার কবলিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত নয়, বরং এটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলা ও দারিদ্র্যের জটিল সমস্যায় জর্জরিত। দেশের উন্নয়ন সূচকে অনেক ক্ষেত্রেই এই অঞ্চলের অবস্থান নিকৃষ্ট। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গাইবান্ধার দারিদ্র্যের হার এখনও জাতীয় গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার চরাঞ্চলগুলোতে দৈনন্দিন গড় আয় অত্যন্ত নিম্নমানের; পরিবারগুলোর অধিকাংশই দৈনিক ২০০ টাকার নিচে আয় করতে পারে, যা একটি মৌলিক জীবনের প্রয়োজনে অনেক কম। এই অর্থনৈতিক অবস্থা শিক্ষাক্ষেত্রে বিপুল প্রভাব ফেলে। দারিদ্র্যের কারণে শিশু-কিশোরদের অধিকাংশই প্রয়োজনীয় শিক্ষাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। যদিও সরকারি প্রচেষ্টায় শিশুদের স্কুলে ভর্তি করার হার কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু ভর্তি হওয়ার পর তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা গ্রহণে টিকে থাকতে পারেন না। অনেক সময় পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপে তাদের সন্তানদের স্কুল থেকে সরিয়ে নিয়ে কাজে লাগায়। বিশেষ করে কৃষিজীবী পরিবারে শিশুদের শিকল খুলে দেয় না মাটির কাজে হাত লাগানো, যেটি পরিবারে আয় বাড়াতে অবদান রাখে। একইসঙ্গে কন্যাশিশুদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সেই বিয়ে দেওয়া হয়, যার ফলে মেয়েরা শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার আরেকটি বড় কারণ হলো শিক্ষার মানের অভাব। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেই পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক। যার ফলে পাঠদান প্রক্রিয়া একঘেয়ে ও অব্যবস্থাপিত হয়ে পড়ে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে লাইব্রেরির অবস্থা দৃষ্টান্তহীন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও জ্ঞানার্জনে প্রয়োজনীয় পাঠ্য উপকরণও সীমিত। বৈচিত্র্যময় শিক্ষণ পদ্ধতির অভাব থাকায় শিক্ষার্থীরা বইয়ের মুখেই আটকে পড়ে, জীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনে তারা পিছিয়ে যায়। তাছাড়া, শিক্ষার পরিবেশেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। বিদ্যালয়ের সঠিক অবকাঠামো না থাকা, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষার্থীদের বসার জায়গার অভাব, শৌচাগার ও পানীয় জলের অনুপস্থিতি—এসব বিষয় শিক্ষার মান ও শিশুদের বিদ্যালয়ে টিকে থাকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বন্যার সময় বিদ্যালয় বন্ধ থাকাটা প্রায় নিয়মিত ঘটনা, যা শিক্ষার ধারাবাহিকতাকে বাধাগ্রস্ত করে।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, দারিদ্র্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারের অবহেলা ও যথাযথ পরিকল্পনার অভাব গাইবান্ধার শিক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল ও অস্থিতিশীল করে তুলেছে। এই অবস্থা দ্রুত পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী ও পরিকল্পিত উদ্যোগ। নয়তো এই জেলার অনেক শিশু দারিদ্র্যের শিকল থেকে মুক্তি পায়নি, এমনকি শিক্ষা ব্যবস্থার অসংগঠিততায় তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করাও ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

ইতিবাচক পরিবর্তন: শিক্ষা নিয়ে নতুন আগ্রহ
গাইবান্ধা তথা দেশের উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করে আসছে। তবে হতাশার সেই ঘনঘোর অন্ধকারে কয়েক বছর ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রের একটি উজ্জ্বল আলো জ্বলতে শুরু করেছে, যা নতুন এক আশা ও পরিবর্তনের সূচনা করেছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা, এনজিও, মিডিয়া এবং বিশেষ করে স্থানীয় তরুণ নেতৃত্বের অবদান, যারা নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার ঘটাচ্ছেন। গত কয়েক বছরে এই অঞ্চলের অনেক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ কার্যক্রম চালু হয়েছে, যা দরিদ্র পরিবারগুলোর সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে আসা ও পুষ্টি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। শিশুদের হাতে সময় মতো ইউনিফর্ম, বইপত্র, খাতা কলম বিতরণ করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয়েছে। এ ছাড়া স্কুলগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যাতে শিশুরা নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
স্থানীয় অনেক মেধাবী তরুণ নিজেদের সম্পদ ও সময় দিয়ে ফ্রি কোচিং সেন্টার, পাঠচক্র ও সাংস্কৃতিক ক্লাস পরিচালনা করছেন। তারা শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবিষয়েই সাহায্য করছেন না, বরং নৈতিক শিক্ষা, নেতৃত্ব গঠন এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর কাজেও নিয়োজিত। এদের এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করছে এবং একটি পজিটিভ কমিউনিটি গড়ে তুলছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষার প্রতি সচেতনতা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়া। অকালেও অনেক দরিদ্র কৃষক ও শ্রমজীবী পরিবার নিজেদের সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর প্রতি আগ্রহী হচ্ছেন। তারা বুঝতে পেরেছেন যে, ‘মাটিতে কাজ করলেই পেট চলে, কিন্তু বই পড়লে ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে।’ এ ধরনের পরিবর্তন সমাজের মূল্যবোধে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়।
এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও শিক্ষাবোর্ডও শিক্ষা উন্নয়নের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। যেমন শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য মনিটরিং, পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ। এসব উদ্যোগ শিক্ষার মানোন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে পরিচালনায় ভূমিকা রাখছে। এসব পরিবর্তনের কারণে গাইবান্ধার শিক্ষার্থীরা শুধু সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, তাদের মধ্যে শিক্ষা গ্রহণের মান ও আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে জেলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। শিক্ষা নিয়ে এই নতুন আগ্রহ ও সচেতনতা একসময় গাইবান্ধার দরিদ্রতা ও পিছিয়ে থাকার অভিশাপ কাটিয়ে তুলে দেবে।

নৈতিক শিক্ষার অভাব: বড় চ্যালেঞ্জ
শিক্ষার মূল লক্ষ্য শুধু বইয়ের পঠন-পাঠন বা পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন নয়, বরং একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা, যার মধ্যে থাকবে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, নৈতিকতা এবং সততা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় আজও এই নৈতিক ও মূল্যবোধগত শিক্ষা যথাযথ গুরুত্ব পাচ্ছে না। পাঠ্যসূচিতে যদিও নৈতিকতার কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও সেগুলো বাস্তব জীবনে যথার্থভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না, ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল বাহ্যিক জ্ঞানে সাফল্য অর্জন করলেও অন্তর্নিহিত মানবিক গুণাবলী থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে। গাইবান্ধাসহ দেশের অনেক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় সাফল্য পেলেও তাদের মধ্যে সামাজিক দায়িত্ব, দেশপ্রেম, সততা, সহানুভূতি ও শৃঙ্খলা কম দেখা যায়। তারা পেশাগত জীবনে সাফল্য অর্জন করলেও একজন আদর্শ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলতে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে থাকে। এর ফলে সমাজে অসহিষ্ণুতা, অসংযম, দুর্নীতি, প্রতারণা ও নৈতিক অবক্ষয় ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সমস্যা শুধু ব্যক্তির নয়, পুরো জাতির জন্য ভয়াবহ সংকেত। এই সংকট মোকাবিলায় এখনই সময় এসেছে নৈতিক শিক্ষা কে শুধু পাঠ্যবইয়ের অংশ হিসেবে না রেখে কার্যকরভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক এবং ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার। বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে সততা, শৃঙ্খলা, সহানুভূতি, সম্মানবোধ, ন্যায়পরায়ণতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো বিষয়গুলোর গুরুত্ব বহুগুণ বাড়াতে হবে। শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজের প্রতিটি স্তরকে এ বিষয়ে দায়িত্ব নিতে হবে এবং তাদের ভূমিকা শুধু তত্ত্বীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে নৈতিক মূল্যবোধের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
নীতিবোধহীন শিক্ষা-ব্যবস্থার প্রভাব স্রেফ ব্যক্তিগত নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নে বড় বাঁধা। একটি দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, সহনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষার বীজ বপন করা প্রয়োজন। এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে বিদ্যালয় পর্যায়ে নৈতিক শিক্ষা ক্লাব গঠন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি কর্মসূচি, অভিভাবক-মতবিনিময় এবং স্থানীয় কমিউনিটি-ভিত্তিক উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ। সরকারের পাশাপাশি, শিক্ষাবিদ, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই পরিবর্তন অসম্ভব। আমাদের সকলের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়—শিশুদের নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমেই দেশকে আরও ভালো, মানবিক ও উন্নততর করে তোলা। কারণ আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের নাগরিক, নেতা এবং দেশগঠনে যোদ্ধা। তাই এখনই সময়, আমাদের সকলে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কাজ করার, যেখানে জ্ঞানের সাথে সমানভাবে গুরুত্ব পাবে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ।

সম্ভাবনার দিগন্ত: সঠিক গাইডলাইন নেতৃত্ব
একজন শিশু বা তরুণ আপনাআপনি কোনো ক্ষেত্রে নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখতে পারে না, তার জন্য প্রয়োজন সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং সঠিক পথপ্রদর্শন। একজন দায়িত্ববান শিক্ষক, অভিজ্ঞ ও দৃষ্টিসম্পন্ন অভিভাবক, সমাজের ইতিবাচক রোল মডেল, এবং সময়োপযোগী সঠিক গাইডলাইন তার বিকাশের অনিবার্য অংশ। গাইবান্ধা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের তরুণরা আজ নিঃস্বার্থভাবে সমাজের উন্নয়নে অবদান রাখছে। কেউ দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে পড়াচ্ছে, কেউ নিয়মিত রক্তদান ও সামাজিক সেবায় অংশ নিচ্ছে, আবার কেউ ঝুঁকিপূর্ণ চরাঞ্চলে গিয়ে শিশুদের হাতে বই, কলম, শিক্ষা সামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছে। এরা সবাই নিজের প্রয়োজনের চিন্তা না করে বৃহত্তর সমাজের কল্যাণকে প্রাধান্য দিচ্ছে- এই মনোভাবই ভবিষ্যতের নেতৃত্বের সবচেয়ে শক্ত ভিত। তবে এই সম্ভাবনাকে শুধু রক্ষা করলেই চলবে না; এটাকে আরও বিস্তৃত ও টেকসই করে গড়ে তুলতে প্রয়োজন সুশৃঙ্খল গাইডলাইন ও শক্তিশালী সংগঠিত কাঠামো। স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তি সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি তরুণবান্ধব, সৃষ্টিশীল এবং উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার। এই পরিবেশই হবে দেশের জন্য একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার মঞ্চ—যারা শুধু নিজের জীবন নয়, সমাজ ও দেশের ভাগ্যও বদলে দিতে পারবে।
প্রতিটি ইউনিয়নে ‘শিক্ষা উন্নয়ন কমিটি’, ‘নৈতিক শিক্ষা ক্লাব’, ‘ইউথ ক্যাম্পেইন টিম’ এবং ‘গ্রামীণ পাঠাগার’ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এসব কমিটি তরুণদের জন্য একটি পাথেয় হিসেবে কাজ করবে, যেখানে তারা নিজেদের দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ বিকাশের সুযোগ পাবে। তাছাড়া, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ইমাম, মসজিদের খতিব, স্থানীয় শিক্ষকমণ্ডলী এবং সচেতন অভিভাবকদের আরো দায়িত্ব নিতে হবে—শিশু-কিশোরদের সামনে নৈতিক, মানবিক ও দায়িত্বশীল জীবনের সরাসরি ও যথাযথ উদাহরণ স্থাপন করার। কারণ ভালো আদর্শ আর নৈতিকতা শিক্ষা ছাড়া কোনো শিক্ষার পূর্ণতা সম্ভব নয়। আমরা যারা সচেতন ও দৃষ্টিসম্পন্ন, আমাদের উচিত এই তরুণদের পাশে দাঁড়ানো। তাদের কাজকে উৎসাহ দেওয়া, সঠিক পথে পরিচালিত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা করা—এই তিনটাই হবে আমাদের কর্তব্য। এতে তারা আত্মবিশ্বাসী হবে, নতুন প্রজন্মের জন্য এক মডেল হয়ে উঠবে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা করবে। তাদের এই যাত্রা সহজ করা মানেই জাতির ভবিষ্যতকে আলোকিত করা। সুতরাং সময় এসেছে আমরা সবাই একসঙ্গে হাত মিলিয়ে এই সম্ভাবনার দিগন্তকে আরো উজ্জ্বল করে তুলি।

করণীয়: সরকারের দৃষ্টি পরিকল্পিত বিনিয়োগ
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও কিছু প্রান্তিক জেলা—বিশেষ করে গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, জামালপুর, নেত্রকোনা ও মেহেরপুর—শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে আছে। এসব জেলায় আর্থ-সামাজিক বৈষম্য প্রকট, যার প্রধান কারণ অনুন্নত অবকাঠামো, অব্যবস্থাপনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অবহেলিত চরাঞ্চলভিত্তিক জীবনযাপন। তাই এই জেলাগুলোকে ‘বিশেষ উন্নয়ন অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সরকার চাইলে ‘এক জেলা, এক সমস্যা, এক পরিকল্পনা’ ভিত্তিতে উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে। এতে প্রতিটি জেলার অনন্য চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা সম্ভব হবে। যেমন চরাঞ্চলভিত্তিক গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে নদীভাঙন, বর্ষাকালে পানিবন্দি অবস্থান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে দূরত্ব এবং যাতায়াত-সংকট, এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় আলাদা প্রকল্প জরুরি।
বিশেষ করে চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থায় অভাবনীয় বিনিয়োগ প্রয়োজন। চরবাসীর জীবনসংগ্রাম এতটাই কঠিন যে সেখানে শিশুরা স্কুলে যেতে চায়, কিন্তু পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতা তাদের পথ রুদ্ধ করে। এমন প্রেক্ষাপটে ভাসমান স্কুল চালু করা যেতে পারে—যা বর্ষাকালেও চলবে। ডিজিটাল শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে ট্যাব-ভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতি চালু হতে পারে। শিশু-কিশোরদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে ‘কমিউনিটি লাইব্রেরি’ এবং ‘মোবাইল লাইব্রেরি’ চালু করা যেতে পারে। চরাঞ্চলে যাতায়াত কষ্টসাধ্য হওয়ায় শিক্ষার্থীদের জন্য সাইকেল বিতরণ কার্যক্রম চালু করা সময়ের দাবি।
তদুপরি, এসব এলাকার শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ইনসেনটিভ, প্রশিক্ষণ ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ চর বা নদীসংলগ্ন এলাকায় শিক্ষক নিয়োগ হয়েও টিকে থাকেন না অনেকেই। অতএব, সরকার যদি শিক্ষা-স্বাস্থ্য-অবকাঠামো—এই তিন খাতকে চর উন্নয়নের ভিত্তি ধরে পরিকল্পিত বিনিয়োগ করে, তাহলে এসব অঞ্চলের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্ভব। চরাঞ্চলের উন্নয়নে নদী নিয়েও ভাবতে হবে। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, যমুনা, ধরলা, আত্রাই, কড়েতোয়া, করতোয়া, দুধকুমার ও ইছামতি—এই সব নদনদী ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের বৃহৎ চরভূমি। এই নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ, খনন, রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই সম্ভব নিরাপদ, সুষ্ঠু ও টেকসই চর উন্নয়ন নিশ্চিত করা। অবহেলিত মানুষ, অবহেলিত অঞ্চল আর অবহেলিত প্রকৃতি—এই তিনকে ঘিরে একটি জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই এখনই দরকার সুনির্দিষ্ট দৃষ্টি, পরিকল্পিত বাজেট, উদ্ভাবনী চিন্তা ও আন্তরিক বাস্তবায়ন।

এক শিশুর হাতেই বদলে যেতে পারে পুরো ভবিষ্যৎ
আজ যে শিশুটি দেশের কোনও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কাঁচা রাস্তায় কাদা মাড়িয়ে, খোলা আকাশের নিচে কিংবা ছোট্ট একটি বস্তির আঁধারে পড়াশোনা করছে, তার মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে অসীম সম্ভাবনার এক নতুন অধ্যায়। হয়তো সে-ই একদিন হয়ে উঠবে দেশের একজন সেবাদক্ষ ডাক্তার, যিনি দূরবর্তী গ্রাম কিংবা চরাঞ্চলের মানুষদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জীবন উৎসর্গ করবেন। হয়তো সে-ই হয়ে উঠবে একজন অনুপ্রেরণাময় শিক্ষক, যিনি দেশের প্রত্যন্ত কোণে থাকা শিশুদের শিক্ষার আলো দেখাবেন। অথবা সে-ই হতে পারে একজন সাহসী সাংবাদিক, যিনি দেশের নানান দুর্নীতি, অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে কন্ঠস্বর তুলে ধরবেন। দেশের প্রতিটি শিশুতে লুকিয়ে আছে এমন এক ক্ষমতা, যাদের আমরা যদি যথাযথ সুযোগ, শিক্ষা ও প্রেরণা দিতে পারি, তবে তারা আজকের দারিদ্র্য, অনাচার ও অবহেলাকে জয় করে দেশের ভাগ্য বদলে দিতে সক্ষম হবে। প্রয়োজন তাদের মাঝে স্বপ্ন জাগানো, তাদের শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে সহায়তা করা এবং তাদের সামনে সুস্পষ্ট ও মসৃণ পথ সৃষ্টি করা।
শিক্ষাই হবে আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র—অন্ধকার ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে, দারিদ্র্য ও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিকতা দূর করতে, আর জাতিকে একটি শক্তিশালী ও প্রগতিশীল ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যেতে। আজকের শিক্ষার্থীরাই কালকের নেতৃত্ব। আমাদের দায়িত্ব হলো তাদের এই নেতৃত্বগুণ বিকাশে অবিচল সহায়তা করা। সারা দেশজুড়ে প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট স্কুল থেকে শুরু করে শহরের বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবখানেই শিক্ষার আলো পৌঁছে দিতে হবে। দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা উপকরণ, পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ পরিবহন ও মানসম্মত শিক্ষক তৈরি করতেই হবে। কারণ, যদি দেশের এক কোণার শিশুটি পিছিয়ে পড়ে, তাহলে পুরো দেশের উন্নয়ন কখনো সম্পূর্ণ হবে না। তাই প্রত্যেক শিশুর স্বপ্নকে সঞ্চারিত করতে, তার শিক্ষা জীবনকে নিরাপদ, আনন্দময় ও ফলপ্রসূ করতে আমাদের সবার সম্মিলিত চেষ্টা জরুরি। একজন শিশুর হাতেই থাকে দেশের পরিবর্তনের শক্তি, তাই তাকে সুযোগ দেয়া আমাদের পবিত্র দায়িত্ব।


                                                                                                                                                               লেখক: কলামিস্ট, গণমাধ্যমকর্মী সংগঠক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category