“আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি”–জাতীয় সংগীতের এই পঙ্ক্তি যখন উচ্চারণ করি, তখন বুকের ভেতর এক ধরনের আবেগ জেগে ওঠে। কিন্তু সেই আবেগের পাশাপাশি আজ একটি প্রশ্নও বারবার ফিরে আসে–আমি যে দেশকে সোনার বাংলা বলি, সেই দেশে আমি কতটা নিরাপদ?
আজকের বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতা শুধু একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যাধি, একটি নৈতিক সংকট এবং অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সম্মিলিত বিবেকের পরাজয়ের প্রতিচ্ছবি। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন মানুষ ঘরের বাইরে ভয় পায়, আবার ঘরের ভেতরেও নিশ্চিন্ত নয়। শিশুরা নিরাপদ নয়, নারীরা নিরাপদ নয়, বৃদ্ধরা নিরাপদ নয়, এমনকি সত্য কথাও অনেক সময় নিরাপদ নয়।
বাংলাদেশ আমাদের জন্মভূমি। এই দেশের মাটি, মানুষ, নদী, সংস্কৃতি ও ইতিহাস আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে। ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি–”সোনার বাংলা”। কিন্তু আজ যখন চারপাশে তাকাই, তখন অনেক সময় মনে হয় এই সোনার বাংলার বুকে এক ধরনের অদৃশ্য ভয় বাসা বেঁধেছে। মানুষ অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলে, বড় বড় সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কথা বলে; কিন্তু একজন সাধারণ মানুষ যদি নিরাপদে বাঁচতে না পারে, তাহলে সেই উন্নয়নের পূর্ণতা কোথায়?
আমার কাছে নিরাপত্তাহীনতা শুধু ছিনতাই, চুরি বা হত্যার ঘটনা নয়। নিরাপত্তাহীনতা হলো সেই অনুভূতি, যখন একজন নারী রাতে একা চলতে ভয় পায়; যখন একজন বৃদ্ধ তার জমি রক্ষা করতে উদ্বিগ্ন থাকেন; যখন একটি শিশু স্কুলে যাওয়ার পথে নিরাপদ নয়; যখন একজন নাগরিক সত্য কথা বলতে সংকোচ বোধ করেন; যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ অপমান, প্রতারণা বা হয়রানির শিকার হয়।
আজকের বাংলাদেশে নিরাপত্তাহীনতার পেছনে কয়েকটি গভীর কারণ রয়েছে।

প্রথমত, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। একসময় পরিবার ছিল মানুষের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সেখানে সততা, সহমর্মিতা, শ্রদ্ধা ও মানবিকতার শিক্ষা দেওয়া হতো। আজ ভোগবাদী প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে সেই মূল্যবোধকে দুর্বল করে দিয়েছে। অর্থ ও ক্ষমতাকে সফলতার একমাত্র মাপকাঠি মনে করার প্রবণতা সমাজে বেড়েছে। ফলে কিছু মানুষ অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করতেও দ্বিধা করে না।
দ্বিতীয়ত, আইনের অসম প্রয়োগ। একজন সাধারণ নাগরিক যখন দেখেন যে ক্ষমতাবান ব্যক্তি সহজে পার পেয়ে যায় কিন্তু দুর্বল ব্যক্তি কঠোর শাস্তি পায়, তখন আইনের প্রতি আস্থা কমে যায়। আইনের প্রতি মানুষের বিশ্বাস দুর্বল হলে অপরাধও বেড়ে যায়।
পঁংঃড়সধৎরষু, মাদক ও কিশোর অপরাধের বিস্তার। আজ অনেক তরুণ মাদকাসক্তি, সহিংসতা ও অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। তারা শুধু নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছে না, সমাজের জন্যও হুমকি হয়ে উঠছে। এর পেছনে পারিবারিক ভাঙন, বেকারত্ব, সামাজিক বৈষম্য এবং সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

তৃতীয়ত, নারীর নিরাপত্তাহীনতা। একটি দেশের সভ্যতার মান নির্ধারিত হয় সেই দেশে নারীরা কতটা নিরাপদ তার ওপর। কিন্তু প্রতিনিয়ত হয়রানি, নির্যাতন ও সহিংসতার খবর আমাদের বিবেককে আহত করে। একজন মা, বোন বা কন্যা যদি নিরাপদ না হন, তাহলে কোনো সমাজই প্রকৃত অর্থে নিরাপদ হতে পারে না।
চতুর্থত, ডিজিটাল অপরাধের বিস্তার। প্রযুক্তির যুগে নতুন ধরনের নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। ভুয়া তথ্য, অনলাইন প্রতারণা, সাইবার বুলিং এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আমার বিশ্বাস, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু বক্তৃতা নয়, কার্যকর ও কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
প্রথমত, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচার দ্রুত এবং স্বচ্ছ হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে হবে। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস নষ্ট করে এবং অপরাধকে উৎসাহিত করে।
তৃতীয়ত, শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে জোরদার করতে হবে। কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই একজন মানুষ ভালো নাগরিক হয় না। তাকে মানবিক, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মানুষ হিসেবেও গড়ে তুলতে হবে।
চতুর্থত, পরিবারকে শক্তিশালী করতে হবে। সন্তানদের সময় দেওয়া, তাদের মানসিক অবস্থা বোঝা এবং নৈতিক শিক্ষা দেওয়া অপরিহার্য। একটি সচেতন পরিবার অনেক অপরাধের জন্মই হতে দেয় না।
পঞ্চমত, নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ আদালত, দ্রুত বিচার এবং ভুক্তভোগী বান্ধব সহায়তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
ষষ্ঠত, মাদক ও কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। শুধু গ্রেপ্তার নয়, পুনর্বাসন এবং সচেতনতার উদ্যোগও জরুরি।
সপ্তমত, নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। অন্যায় দেখেও নীরব থাকা এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়া প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের কর্তব্য।

আমি মনে করি, নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু আইন নয়, মানুষের বিবেক। যখন একজন মানুষ অন্য মানুষের কষ্ট অনুভব করবে, যখন ন্যায়বোধ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে, তখনই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হবে।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো–আমরা ধীরে ধীরে এই অনিরাপত্তার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গেছি। একটি ধর্ষণের খবর আমাদের আর আগের মতো নাড়া দেয় না। একটি খুনের সংবাদ কয়েক ঘণ্টার আলোচনার বিষয় হয়, তারপর নতুন ঘটনার ভিড়ে হারিয়ে যায়। একটি দুর্নীতির কাহিনি আমাদের বিস্মিত করে না, কারণ আমরা ধরে নিয়েছি এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এত অস্বাভাবিক বিষয়কে আমরা কেন স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছি?
আমার কাছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাহীনতা শুরু হয় মানুষের নৈতিক নিরাপত্তাহীনতা থেকে। আমরা অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বলি, কিন্তু মানবিক উন্নয়নের কথা কতটা বলি? আমরা বহুতল ভবন নির্মাণ করেছি, কিন্তু চরিত্র নির্মাণে কতটা সফল হয়েছি? আমরা প্রযুক্তিতে এগিয়েছি, কিন্তু বিবেক কি সমান তালে এগিয়েছে?
আজ অনেকেই অর্থকে সফলতার একমাত্র মানদণ্ড মনে করে। একজন মানুষ কীভাবে অর্থ উপার্জন করছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো তার ব্যাংক ব্যালেন্স। ফলে সততা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নিচ্ছে প্রতারণা, দুর্নীতি, শোষণ ও অপরাধ।
দুর্নীতি বাংলাদেশের নিরাপত্তাহীনতার আরেকটি বড় কারণ। দুর্নীতি শুধু অর্থ চুরি করে না; এটি মানুষের বিশ্বাস চুরি করে। যখন একজন নাগরিক দেখে যে আইন সবার জন্য সমান নয়, তখন তার রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়। আর যেখানে আস্থা ভেঙে পড়ে, সেখানে নিরাপত্তাবোধও ভেঙে পড়ে।
আমরা প্রায়ই অপরাধীদের দোষ দিই, কিন্তু নিজেদের দিকে কি তাকাই? একজন ঘুষদাতা এবং একজন ঘুষগ্রহীতা দুজনেই দুর্নীতির অংশ। একজন অন্যায় করে, আরেকজন অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়। ফলে অপরাধ শুধু অপরাধীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সমাজের রক্তনালীতে ছড়িয়ে পড়ে।
নারীর নিরাপত্তাহীনতা বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর লজ্জার বিষয়। আমরা মাকে সম্মান করার কথা বলি, নারীর মর্যাদার কথা বলি, কিন্তু বাস্তবে কতটা পালন করি? একটি মেয়ে জন্মের পর থেকে নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করতে শেখে। তার পোশাক, তার চলাফেরা, তার সময়–সবকিছু নিয়ে সতর্ক থাকতে হয়। প্রশ্ন হলো, কেন অপরাধীর স্বাধীনতা থাকবে, আর ভুক্তভোগীকে সতর্ক থাকতে হবে?

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো শিশুদের নিরাপত্তা। যে শিশুদের হাতে বই থাকার কথা, তারা অনেক সময় সহিংসতা, মাদক ও অপরাধের বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। কিশোর গ্যাং সংস্কৃতি হঠাৎ করে তৈরি হয়নি; এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক অবহেলা, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এবং মূল্যবোধের সংকটের ফল।
ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আমরা দেখেছি। কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা কি নিশ্চিত করতে পেরেছি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপমান, ভুয়া তথ্য, প্রতারণা এবং চরিত্রহনন এখন নতুন ধরনের সহিংসতা। এখানে রক্ত ঝরে না, কিন্তু মানুষের জীবন ধ্বংস হয়ে যায়।
আমার কাছে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো আমরা অনেক সময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলছি। অন্যায় দেখেও চুপ থাকা যেন সামাজিক রীতি হয়ে গেছে। কারণ মানুষ ভয় পায়। আর যে সমাজে ভয় সত্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, সেই সমাজ কখনো নিরাপদ হতে পারে না।
নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে বিশ্বের সফল দেশগুলোর দিকে তাকানো দরকার। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আমার বারবার মনে হয়–পৃথিবীর অন্য দেশগুলো কি এই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়নি? তারা কি অপরাধ, দুর্নীতি, মাদক, নারী নির্যাতন কিংবা সামাজিক অবক্ষয়ের সংকটে পড়েনি? অবশ্যই পড়েছে। আজ যে দেশগুলোকে আমরা উন্নত, নিরাপদ এবং সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র হিসেবে দেখি, তারা রাতারাতি সেই অবস্থানে পৌঁছায়নি। তাদেরও দীর্ঘ সংগ্রাম, ভুল, ব্যর্থতা এবং কঠোর আত্মসমালোচনার ইতিহাস রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ছিল ধ্বংসস্তূপে পরিণত একটি দেশ। শহর ধ্বংস, অর্থনীতি বিধ্বস্ত, মানুষের জীবনে অনিশ্চয়তা। কিন্তু তারা বুঝেছিল, একটি জাতিকে পুনর্গঠন করতে হলে শুধু অবকাঠামো নয়, চরিত্রও গড়তে হবে। তারা শিক্ষাব্যবস্থা, শৃঙ্খলা, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাকে জাতীয় সংস্কৃতির অংশে পরিণত করেছিল। ফলে আজ জাপানে হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগও অনেক সময় মালিকের কাছে ফিরে আসে। কারণ সেখানে আইন শুধু পুলিশের হাতে নয়, মানুষের বিবেকেও বাস করে।
সিঙ্গাপুরের কথাও বলা যায়। একসময় এটি ছিল সম্পদহীন, সীমিত সুযোগের একটি ছোট দ্বীপরাষ্ট্র। দুর্নীতি, অপরাধ এবং অব্যবস্থাপনা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু রাষ্ট্র কঠোরভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। আইনকে শক্তিশালী করা হয়, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়। ফলাফল–আজ সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ রাষ্ট্র।
দক্ষিণ কোরিয়ার গল্পও আমাদের জন্য শিক্ষণীয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির কাতারে উঠে এসেছে। তারা বুঝেছিল, জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হলো দক্ষ ও নৈতিক নাগরিক।
নর্ডিক দেশগুলো দেখিয়েছে কেবল কঠোর আইন নয়, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানসম্মত শিক্ষা, নাগরিক আস্থা এবং স্বচ্ছ প্রশাসন একটি নিরাপদ সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি। অথচ আমরা অনেক সময় উন্নয়নকে কেবল সেতু, ভবন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ করে ফেলি। কিন্তু উন্নয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মানুষ কতটা নিরাপদ, কতটা সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারছে।
একটি দেশের সাফল্য তখনই অর্থবহ হয়, যখন একজন নারী রাতের পথে নিরাপদে চলতে পারেন, একজন বৃদ্ধ ন্যায্য অধিকার পান, একজন শিশু নির্ভয়ে বড় হতে পারে এবং একজন সাধারণ নাগরিক বিচার পাওয়ার আশায় আদালতের দরজায় দাঁড়িয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসেন না।
বাংলাদেশের সম্ভাবনা কোনো অংশে কম নয়। আমাদের আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আছে দুর্যোগ জয়ের অভিজ্ঞতা, আছে পরিশ্রমী মানুষ, আছে তরুণ প্রজন্মের শক্তি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তার মানুষ, তাকে সঠিক কাজে লাগানো। এই মানুষই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। তাই নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ার ক্ষমতাও এই মানুষের মধ্যেই রয়েছে।
তবে তার আগে আমাদের একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে। নিরাপত্তাহীনতার জন্য শুধু রাষ্ট্র নয়, সমাজও দায়ী; শুধু সমাজ নয়, আমরাও দায়ী। যেদিন আমরা নিজেদের ভুলের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারব, সেদিনই নিরাপত্তাহীনতার অন্ধকার দূর হতে শুরু করবে।
সোনার বাংলা কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে তৈরি হয় না; সোনার বাংলা তৈরি হয় ন্যায়বিচার, মানবিকতা, সততা, সাহস এবং নিরাপত্তার ভিত্তির ওপর। আর সেই ভিত্তি দুর্বল হলে আকাশছোঁয়া উন্নয়নও একদিন বালুর বাঁধের মতো ভেঙে পড়তে পারে। তাই আজ সময় এসেছে নিজেদের প্রশ্ন করার, আমরা কি সত্যিই নিরাপদ, নাকি নিরাপত্তার একটি সুন্দর ভ্রমের মধ্যে বাস করছি?
কিন্তু একটি বিষয় আমাদের স্বীকার করতেই হবে–অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিক উন্নয়ন, আইনের শাসন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমরা উন্নয়নের ভবন নির্মাণ করব, কিন্তু তার ভিত দুর্বলই থেকে যাবে।
পৃথিবীর সফল দেশগুলো আমাদের একটি শিক্ষা দেয়–কোনো জাতি শুধু সম্পদ দিয়ে বড় হয় না; বড় হয় ন্যায়বিচার, সততা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা এবং জবাবদিহিতার মাধ্যমে। সুতরাং প্রশ্ন আজ বাংলাদেশ কত বড় অর্থনীতি হবে, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কি এমন একটি রাষ্ট্র হতে পারবে, যেখানে মানুষ ভয় নয়, আস্থা নিয়ে বাঁচবে?
তাহলে সমাধান কী?
প্রথমত, আইনের কঠোর এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর পরিচয়, দল, প্রভাব বা অর্থ যেন বিচারকে প্রভাবিত না করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রকৃত অর্থে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু ছোট কর্মচারী নয়, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতিবাজদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে পরীক্ষামুখী নয়, মানুষ গড়ার শিক্ষায় রূপান্তর করতে হবে। নৈতিতা, সহমর্মিতা এবং নাগরিক দায়িত্ববোধকে গুরুত্ব দিতে হবে।
চতুর্থত, পরিবারকে আবার মূল্যবোধের বিদ্যালয়ে পরিণত করতে হবে। সন্তানকে শুধু সফল নয়, সৎ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।
পঞ্চমত, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা ভাঙতে হবে। কারণ নীরব মানুষ কখনো নিরাপদ সমাজ নির্মাণ করতে পারে না।
বাংলাদেশকে আমরা সোনার বাংলা বলি। স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় পরে আমরা উন্নয়নের নানা সূচকে এগিয়েছি। উঁচু সেতু হয়েছে, মেট্রোরেল হয়েছে, প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে, অর্থনীতির আকার বেড়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন আজও আমাকে তাড়া করে বেড়ায় মানুষ কি নিরাপদ হয়েছে?
উন্নয়নের পরিসংখ্যান যতই উজ্জ্বল হোক, সাধারণ মানুষের জীবনে যদি নিরাপত্তা না থাকে, তাহলে সেই উন্নয়ন অনেকটাই বাহ্যিক। কারণ নিরাপত্তা শুধু পুলিশের পাহারা নয়; নিরাপত্তা হলো মানুষের মনে আস্থা থাকা যে সে ন্যায়বিচার পাবে, সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে, তার সন্তান নিরাপদে বড় হবে, তার ঘর-সংসার অরক্ষিত থাকবে না।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো নিরাপত্তাহীনতা। এই নিরাপত্তাহীনতা শুধু রাস্তায় নয়, ঘরেও; শুধু বাস্তবে নয়, মানসিকতাতেও; শুধু অপরাধে নয়, বিচারহীনতার সংস্কৃতিতেও।
ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। মানুষ প্রতিবাদ করছে। মিডিয়া সরব হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তাল হচ্ছে। অপরাধী গ্রেপ্তারও হচ্ছে। কিন্তু তারপর? কয়েক সপ্তাহ পর নতুন একটি ঘটনা পুরনো ঘটনাকে চাপা দিয়ে দেয়। ভুক্তভোগী পরিবার বছরের পর বছর বিচার চেয়ে অপেক্ষা করে। সমাজ ধীরে ধীরে ভুলে যায়। যেন মানুষের মর্যাদা নয়, সংবাদচক্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, ধর্ষণ বা নারী নির্যাতনের ঘটনা এখন আর মানুষকে আগের মতো স্তম্ভিত করে না। আমরা যেন অভ্যস্ত হয়ে গেছি। একটি সভ্য সমাজের জন্য এর চেয়ে বড় বিপদ আর কী হতে পারে?
একসময় বলা হতো, “বাড়ি মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।” কিন্তু আজ সেই ধারণাও প্রশ্নের মুখে। সংবাদপত্র খুললেই দেখা যায় গৃহকর্মীর হাতে খুন, আত্মীয়ের হাতে নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা, সম্পত্তির লোভে হত্যা। মানুষ বাইরে যেমন আতঙ্কে, ভেতরেও তেমনি অনিশ্চয়তায়।
শুধু তাই নয়, নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ও আজ একটি বড় সামাজিক সংকট। মা-বাবার প্রতি সন্তানের সম্মান কমে যাচ্ছে এমন অভিযোগ এখন অনেক পরিবারে শোনা যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সন্তানরাও অভিযোগ করে যে তারা যথাযথ স্নেহ, সময় ও নৈতিক দিকনির্দেশনা পায়নি। ফলে পরিবার, যা একসময় চরিত্র গঠনের প্রথম বিদ্যালয় ছিল, আজ অনেক ক্ষেত্রে দ্বন্দ্ব, বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক দূরত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি, কেন কিশোর গ্যাং তৈরি হয়? কেন একজন তরুণ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে? কেন একজন শিক্ষিত মানুষও প্রতারণা করে? এর পেছনে শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, সামাজিক ব্যর্থতাও কাজ করে। যখন সমাজে অর্থ ও ক্ষমতাই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি হয়ে যায়, তখন নৈতিকতা ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে থাকে।
মাদক আজ শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি একটি সামাজিক মহামারী। মাদক একটি পরিবারকে ধ্বংস করে, একজন তরুণের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে, অপরাধকে উসকে দেয় এবং সমাজে সহিংসতার জন্ম দেয়। মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযান হয়, গ্রেপ্তার হয়, কিন্তু প্রশ্ন হলো মাদকের সরবরাহচক্র কেন বারবার ফিরে আসে? কেন নতুন প্রজন্ম বারবার একই ফাঁদে পড়ে?
আরেকটি বড় সমস্যা হলো বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার সংকট। সাধারণ মানুষ চায় অপরাধের সুষ্ঠু বিচার হোক। কিন্তু যখন মামলার পর মামলা বছরের বছর ঝুলে থাকে, যখন ভুক্তভোগী বিচার পাওয়ার আগেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে ন্যায়বিচার কি সত্যিই সবার জন্য সমান?
একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন অপরাধী আইনকে ভয় পায় এবং নিরপরাধ মানুষ আইনকে বিশ্বাস করে। কিন্তু যদি অপরাধী ভয় না পায় এবং সাধারণ মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।
আমাদের সমাজে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো নীরবতা। অন্যায় দেখেও আমরা অনেক সময় মুখ খুলি না। কারণ আমরা ঝামেলায় জড়াতে চাই না। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতা শেষ পর্যন্ত অন্যায়কেই শক্তিশালী করে। আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন শুধু কঠোর আইন নয়, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার নয়, দ্রুত ও দৃশ্যমান বিচার। শুধু উন্নয়নের অবকাঠামো নয়, নৈতিকতার অবকাঠামো। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, মানবিক প্রবৃদ্ধি। আমি এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যেখানে কোনো মা তার মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকবে না; যেখানে বৃদ্ধ বাবা-মা সন্তানের অবহেলায় চোখের জল ফেলবেন না; যেখানে মাদক একজন তরুণের স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারবে না; যেখানে বিচার পেতে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না; যেখানে মানুষের পরিচয় নয়, ন্যায়বিচারই সবচেয়ে বড় শক্তি হবে।
নবপধঁংব সোনার বাংলা শুধু উঁচু ভবন, বড় রাস্তা বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে গড়ে ওঠে না। সোনার বাংলা গড়ে ওঠে নিরাপদ মানুষ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, মানবিক মূল্যবোধ এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রের ওপর। আর যদি সেই নিরাপত্তা, সেই ন্যায়বিচার, সেই মানবিকতা হারিয়ে যায়, তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায় আমরা কি সত্যিই সোনার বাংলায় বাস করছি, নাকি সোনার রঙে রাঙানো এক গভীর অনিরাপত্তার ভেতর দিন কাটাচ্ছি?
বাংলাদেশের সম্ভাবনা কোনো অংশে কম নয়। আমাদের আছে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আছে দুর্যোগ জয়ের অভিজ্ঞতা, আছে পরিশ্রমী মানুষ, আছে তরুণ প্রজন্মের শক্তি। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের স্বীকার করতেই হবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি নৈতিক উন্নয়ন, আইনের শাসন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে আমরা উন্নয়নের ভবন নির্মাণ করব, কিন্তু তার ভিত দুর্বলই থেকে যাবে।
আমি মনে করি, নিরাপত্তাহীনতার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু আইন নয়, মানুষের বিবেক। যখন একজন মানুষ অন্য মানুষের কষ্ট অনুভব করবে, যখন ন্যায়বোধ ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান পাবে, তখনই প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব হবে। আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে মানুষ দরজা খুলে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে; যেখানে একটি মেয়ে নির্ভয়ে স্কুলে যাবে; যেখানে বৃদ্ধরা সম্মান নিয়ে বাঁচবেন; যেখানে আইন হবে সবার জন্য সমান; যেখানে ভয়ের পরিবর্তে আস্থা, অবিশ্বাসের পরিবর্তে মানবিকতা এবং নিরাপত্তাহীনতার পরিবর্তে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। সেদিনই সত্যিকার অর্থে আমরা বলতে পারব এটাই আমার সোনার বাংলাদেশ। কারণ একটি নিরাপদ রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত একটি সত্যিকারের উন্নত রাষ্ট্র।
লেখক: কবি, কলামিস্ট, প্রকাশক ও সমাজকর্মী