প্রতীক ওমর
প্রতিদিন ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই দেশের একমাত্র আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো টার্মিনালে এক বিষণ্ন নীরবতা জেঁকে বসে। সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন একের পর এক কাঠের কফিন বেরিয়ে আসে, তখন স্বজনদের আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে আশপাশ। নিমিষেই হয়ে ওঠে জাতীয় এক ট্র্যাজেডির প্রতিচ্ছবি। গত এক দশকে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা প্রবাসী শ্রমিকদের এই নীরব প্রস্থান এক ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। পরিসংখ্যানের ভাষায় যদি বলা হয়, তবে চিত্রটি অত্যন্ত মর্মস্পর্শী। বর্তমান সময়ে গড়ে প্রতিদিন অন্তত ১৩ জন প্রবাসী শ্রমিকের নিথর দেহ দেশে ফিরছে। মাসে এই সংখ্যা গিয়ে ঠেকছে প্রায় ৪০০ জনে। আর বছর শেষে আমরা যখন রেমিট্যান্সের হিসাব কষতে বসি, তখন দেখি চার থেকে পাঁচ হাজার শ্রমিকের নিশ্বাস বিদেশের মাটিতেই চিরতরে থমকে গেছে। ২০২৪ সালের তথ্যানুযায়ী, কেবল এক বছরেই ৪,৮১৩ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে এসেছে, যা বিগত যেকোনো সময়ের তুলনায় আশঙ্কাজনক।
এই মৃত্যুর মিছিল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ১০ বছরে প্রায় ৩৩,৯৯১ জন শ্রমিকের স্বপ্ন কাঠের কফিনে বন্দি হয়ে নিজ ভিটায় ফিরেছে। এটি কেবল তাদের হিসাব, যাদের মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হয়েছে। বিদেশের মাটিতেই দাফন হওয়া বহু শ্রমিকের হাহাকার এই তালিকায় যুক্ত করলে সংখ্যাটি আরও দীর্ঘ হবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই মৃতদের অধিকাংশেরই বয়স ৩৮ থেকে ৪২ বছরের মধ্যে। জীবনের যে সময়টিতে একজন মানুষের সবচেয়ে বেশি কর্মক্ষম থাকার কথা, সেই মধ্যগগনেই তারা ঢলে পড়ছেন মৃত্যুর কোলে। কেন এই বয়সের মানুষগুলো এত বেশি সংখ্যায় মারা যাচ্ছেন, তা আজ গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা হচ্ছে স্ট্রোক কিংবা হার্ট অ্যাটাক। কিন্তু এই মৃত্যুর গভীর কারণগুলো তলালে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। হাড়ভাঙা খাটুনি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অপর্যাপ্ত ঘুম এবং বিদেশের মাটিতে প্রচণ্ড মানসিক চাপই মূলত তাদের শরীরকে ভেতরের দিক থেকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ঘটছে সৌদি আরবে। এরপর রয়েছে মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং কুয়েতের নাম। মধ্যপ্রাচ্যের তীব্র দাবদাহে যখন একজন শ্রমিক খোলা আকাশের নিচে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন, তখন তার শরীর যে পানিশূন্যতা ও ক্লান্তির মধ্য দিয়ে যায়, তা অনেক সময়ই সহ্যসীমার বাইরে চলে যায়। বিশেষ করে মরু অঞ্চলের উত্তপ্ত আবহাওয়া এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাব এই অকাল মৃত্যুর পেছনে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। আমাদের দেশের শ্রমিকদের একটি বড় অংশই অদক্ষ বা অর্ধ দক্ষ হিসেবে বিদেশে পাড়ি জমান। সেখানে গিয়ে তারা যে ধরনের প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করেন এবং যে নিম্নমানের বাসস্থানে রাত কাটান, তা স্বাস্থ্যঝুঁকিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই ধারদেনা করে বা জমি বিক্রি করে বিদেশে যান, যার ফলে মাথার ওপর ঋণের যে বোঝা চেপে থাকে, সেই দুশ্চিন্তায় তাদের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এই মানসিক চাপের সঙ্গে যোগ হয় পুষ্টিকর খাদ্যের অভাব। ফলে মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানেই তাদের হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে যায়।
মৃত্যুর পরিসংখ্যান হাজার হাজার পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পতনের ইতিহাস। যখন একজন উপার্জনক্ষম ব্যক্তি মারা যান, তখন সেই পরিবারের স্বপ্নগুলোও সেই কফিনের সঙ্গেই দাফন হয়ে যায়। অনেক পরিবার তাদের শেষ সম্বলটুকু খরচ করে পরিবারের বড় ছেলেকে বা স্বামীকে বিদেশে পাঠায়। সেই মানুষটি যখন লাশ হয়ে ফেরে, তখন সেই পরিবারটি অন্ধকার অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়। বিশেষ করে মৃত শ্রমিকের সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং বিধবা স্ত্রীদের সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় বড় সংকট তৈরি করে। যদিও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড মরদেহ দাফন ও পরিবারকে কিছু আর্থিক সহায়তা প্রদান করে, কিন্তু সেটি দীর্ঘমেয়াদে সেই শূন্যতা পূরণে যথেষ্ট নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিদেশের মাটিতে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বীমা ব্যবস্থার দুর্বলতা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শ্রমিকরা অসুস্থ বোধ করলেও কেবল চাকরি হারানোর ভয়ে বা চিকিৎসার খরচ জোগাতে না পেরে ডাক্তারের কাছে যান না। প্রাথমিক লক্ষণগুলো এড়িয়ে যাওয়ার ফলে সাধারণ সমস্যাগুলো একসময় বড় ধরনের স্ট্রোকে রূপ নেয়। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবও অনেক সময় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন বা কলকারখানায় কাজ করার সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম না থাকায় অনেক তাজা প্রাণ অকালে ঝরে যায়। সড়ক দুর্ঘটনাও প্রবাসী মৃত্যুর অন্যতম একটি কারণ। বিদেশের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকা বা ক্লান্ত শরীরে গাড়ি চালানোর ফলে এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটছে।
গত দশ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৪ সাল থেকে পরবর্তী প্রতিটি বছরই এই মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। ২০২০ সালে মহামারীর কারণে এই সংখ্যা কিছুটা স্থবির মনে হলেও ২০২১ সাল থেকে পুনরায় তা ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে। ২০২৩ এবং ২০২৪ সালে এসে এটি চরম আকার ধারণ করেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পরিস্কার হয় যে, অভিবাসন প্রক্রিয়ায় কোথাও না কোথাও বড় ধরনের গলদ রয়ে গেছে। বিশেষ করে বিদেশ যাওয়ার আগে শ্রমিকদের যে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়, তার গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। সুস্থ মানুষ বিদেশে গিয়ে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে কেন হৃদরোগে আক্রান্ত হবেন, তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। অনেকে মনে করেন, দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা এবং প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতাও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, যা পরোক্ষভাবে শারীরিক অসুস্থতার দিকে ঠেলে দেয়।
বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের এই করুণ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আরও জোরালো ভূমিকা প্রয়োজন। শুধু রেমিট্যান্সের অংক দিয়ে একজন প্রবাসীর মূল্যায়ন না করে, তাদের জীবনের মূল্য কতটুকু তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর শ্রম উইংকে আরও সক্রিয় হতে হবে। বিশেষ করে যেখানে শ্রমিকরা গাদাগাদি করে থাকেন বা যেখানে কাজের পরিবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, সেখানে নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর আগে সেখানকার আবহাওয়া ও জীবনযাত্রার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ ওরিয়েন্টেশন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। এছাড়া প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক জীবন বীমা এবং সেখানে উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করা গেলে মৃত্যুর হার অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, এই পরিসংখ্যানগুলো আমাদের সমাজের এক ক্ষতবিক্ষত রূপ তুলে ধরে। যে মানুষগুলো নিজের দেশ ছেড়ে অজানা গন্তব্যে পাড়ি জমান কেবল পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, তাদের শেষ বিদায়টা যেন অন্তত এমন সম্মানজনক হয় যেখানে অকাল মৃত্যুর ছায়া থাকবে না। আমাদের জাতীয় অর্থনীতির এই কারিগরদের অকাল মৃত্যু রোধ করা এখন সময়ের দাবি। এটি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতাও বটে। প্রতিদিন বিমানবন্দরে আসা প্রতিটি কাঠের কফিন আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের কাছে একেকটি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে যায়। সেই প্রশ্নের উত্তর যদি আমরা আজ খুঁজে না পাই, তবে এই পরিসংখ্যান আগামী বছরগুলোতে আরও দীর্ঘ ও শোকাবহ হবে।
অভিবাসন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অসাধু চক্রের খপ্পরে পড়ে শ্রমিকরা যে পরিমাণ টাকা খরচ করেন, তা তুলতে তাদের দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়। এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে পারলে শ্রমিকদের ওপর থেকে মানসিক চাপ কমে আসবে। প্রবাসীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন এবং তাদের প্রকৃত শ্রমের মর্যাদা দেওয়াই হতে পারে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান।
লেখক, সম্পাদক মাসিক আলোচনা