• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন

জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক মৃত্যু

Reporter Name / ১১২ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

মনজু রহমান

গত ৫৪ বছরে স্বাধীন বাংলাদেশে কত রাজনৈতিক দল আমরা দেখলাম, দেখলাম দলের বাঘা বাঘা নেতা ও দল গঠনের প্রক্রিয়া। বাংলাদেশ এমনই এক দুর্ভাগা দেশ যেখানে অধিকাংশ দলই গঠিত হওয়ার পর বেশি দিন ধরে রাখতে পারে না, বা নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থের ছাড় না দেওয়ার কারণে তাদের মতভেদ চরম পর্যায়ে ওঠে, ফলস্বরূপ ঘটে ভাঙন। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দলগুলো ‘এক নেতা এক দলে’ পরিণত হয়েছে। আমরা দেখেছি যখন প্রেসিডেন্ট জিয়ার শাসন চলছে, তখন আওয়ামী লীগেরও ভঙ্গুর দশা। একদিকে আব্দুর রাজ্জাকের বাকশাল, অন্যদিকে সাজেদা চৌধুরী, আব্দুল মালেক উকিল, মহিউদ্দিনদের ভঙ্গুর আওয়ামী ঘরানার নাজেহাল অবস্থা। সে সময় ড. কামাল হোসেন আওয়ামী লীগকে জোড়া লাগানোর জন্য প্রেসিডেন্ট জিয়ার সাহায্য চাইলেন শেখ হাসিনাকে দেশে আসার অনুমতির জন্য। প্রেসিডেন্ট জিয়া ড. কামাল হোসেনের অনুরোধ ফেলতে পারেননি। শেখ হাসিনা দেশে এসে বহুধা বিভক্ত আওয়ামী লীগকে জোড়া লাগালেন। তারপরের ঘটনা তো সবাই জানেন। এক সময়ের মণি সিংহের কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ (মোজাফফর), ইনুদের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), মুসলিম লীগ; এরকম প্রায় শতাধিক দল আছে যেসব দল গঠনের পর প্রায় বিলীন হয়ে গেছে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। ফলে জাতীয় নির্বাচনে সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলগুলো মূল যে দু-একটি দল আছে, তাদের কেউ বিএনপি আবার কেউ আওয়ামী লীগের সাথে জোট বেঁধে ১১, ১২ বা ১৪ দলে রূপান্তরিত হয়ে আন্দোলনে নামে এবং জাতীয় পর্যায়ে শরিক দল হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে আমরা দেখেছি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে প্রচণ্ড পরাক্রমশালী জাসদই (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে এখন ৪ টুকরা হয়ে চার দিকে ছড়িয়ে আইসিইউতে ধুঁকে ধুঁকে কোনো মতে শ্বাস টানছে। শুধু জাসদ কেন, বাম ঘরানার অনেক দল যেমন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, জেএসডি, গণফ্রন্ট, বাংলাদেশ ন্যাপ, গণফোরাম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ বাম ঘরানার দলগুলো তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়ে কোনো মতে টিকে আছে। কোনো মতে টিকে আছে জাকের পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, নেজামী ইসলামী পার্টি, ইসলামী ঐক্যফ্রন্টের মতো এককালে অভিজাতখ্যাত ক্ষয়িষ্ণু দলগুলোও। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অনেক রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়েছে যা এক ব্যক্তি সর্বস্ব। এর মধ্যেই সরাসরি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. ইউনূসের আশীর্বাদপুষ্ট তরুণদের দিয়ে এনসিপি নামক দল গঠন হলেও সে দলের সূচনালগ্নেই সেই তারুণ্যনির্ভর দলও নিজেদের কর্মে ও ভাঙনের মুখে কোনো মতে টিকে আছে। এই তারুণ্যনির্ভর এনসিপির আয়ু কতদিন টিকে থাকবে তা ভবিষ্যৎই বলে দেবে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহের আলোচনার বীজ ঘুরে ফিরে আসছে।

উপরে উল্লেখিত রাজনৈতিক দল নিয়ে জনমনে খুব যে কৌতূহল ছিল বা আছে তেমন নয়, যতটুকু ছিল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের গড়া জাতীয় পার্টির বেলায়। কারণ জাতীয় পার্টির জন্ম হয়েছিল দুর্দান্ত প্রতাপশালী সাবেক সেনাপ্রধান ও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মাদ এরশাদের হাত ধরে। তিনি অস্ত্রের মুখে বিচারপতি সাত্তারের কাছ থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা জবরদখল করে এই নতুন দল তৈরি করেন ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি। রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেই জাতীয় পার্টি ১৯৮৬ সালে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেয় এবং একলাফে ১৫৩টি সংসদীয় আসন দখল করে এরশাদ সামরিক লেবাস ছেড়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এই নির্বাচনে সহযোগিতা করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ। সে সময় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে সরাসরি অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। তার লক্ষ্য ছিল বিএনপি নামক দলকে সমূলে বিলীন করা। যা হোক, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি সারা দেশের জেলা-উপজেলায় বিস্তার লাভ করে। এবং ২ বছর পর চতুর এরশাদ ১৯৮৮ সালে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫১টি আসনে জয়ী হয়ে জাতীয় সংসদে প্রধান দল হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়। অবশ্য সে নির্বাচনে দেশের সকল বিরোধী দল অংশ না নিয়ে নির্বাচন বর্জন করেছিল। তারপর শুরু হয় এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। দেশে তখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। এই আন্দোলনের মুখে ১৯৯১ সালে এরশাদ পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিতে বাধ্য হন। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ২৫১ আসন থেকে এক লাফে নেমে ৩৫টি আসনে জয়ী হয়ে তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান জিয়িয়ে রাখে। ক্ষমতায় আসে বিএনপি। সে সময় জাতীয় পার্টি, আওয়ামী লীগসহ সব দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের মুখে বিএনপি ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেয়। সে নির্বাচনেও কোনো দলই অংশ নেয়নি। ফেব্রুয়ারির সে নির্বাচনের পর বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে। ওই বছরই ১৯৯৬ সালের জুন মাসে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় এবং জাতীয় পার্টি সে নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৩২টি আসনে বিজয়ী হয়ে পুনরায় তৃতীয় বৃহত্তম দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের সাথে জোট বেঁধে ১৪টি আসন লাভ করে। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জাতীয় পার্টি দেশের অপরাপর দল নিয়ে মহাজোট গঠন করে এবং জোটের শরিক দল হিসেবে ২৭টি আসন লাভ করে। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩৪ আসন পেয়ে পুনরায় তৃতীয় প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান জানান দেয়। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২৬টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল। এরশাদের মৃত্যুর পর তার সহোদর জি এম কাদেরের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টি জোটবদ্ধ হয়ে ১১টি আসন পেয়ে ইতিহাসের সর্বনিম্ন আসন নিয়ে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখে। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে জাতীয় পার্টি একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেনি; বরং সবগুলো আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা তাদের জামানত হারান। এ নির্বাচনে শুধু জাতীয় পার্টিই নয়, পুরাতন এবং সদ্য গজিয়ে ওঠা আরও ২২টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়ে একটি আসনও পায়নি, সবগুলো দল জামানত হারায়।

এ তো গেল জাতীয় পার্টির নির্বাচনের হাল। কেন জাতীয় পার্টির এমন অবস্থা বা ভূমিধস হলো তার ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে বলে অনেকেই মনে করেন। হু. মো. এরশাদ ছিলেন বাংলাদেশের দীর্ঘতম শাসক। তার শাসনকাল ছিল টানা নয় বছর। এই নয় বছরে তিনি ইচ্ছামতো তার শাসন চালিয়েছেন এবং প্রায় তিনশোর উপরে মন্ত্রী নিয়োগ করেছেন। বিএনপি এবং অন্যান্য দল থেকে অনেক বাঘা বাঘা নেতাকে তিনি ভাগিয়ে এনে পূর্ণ মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদ দিয়েছেন। যেমন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মশিউর রহমান রাঙা, রুহুল আমিন হাওলাদার, মামদুদুর রহমান চৌধুরী, এ বি এম শাহজাহান, জি এম কাদের, রওশন এরশাদ, সালমা ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, বিদিশা এরশাদ, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারীসহ অসংখ্য হেভিওয়েট নেতা নির্ভর দলের এমন করুণ পরিণতির কারণ কী?

যেখানে জাতীয় পার্টির দুর্গ ছিল বৃহত্তর রংপুর যেমন রংপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম। রংপুর ছাড়াও সিলেট, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, বগুড়াসহ সারাদেশে জাতীয় পার্টির ভিত যথেষ্ট মজবুত ছিল। বাংলাদেশের বৃহৎ দল হিসেবে ৬৪ জেলা ও উপজেলায় জাতীয় পার্টির মূল ও অঙ্গ সংগঠনও ছিল। তেমনি ছিল জি এম কাদের, রওশন, বিদিশা, মশিউর রহমান রাঙা, আনিসুল ইসলাম মাহমুদসহ চতুর্মুখী অন্তর্দ্বন্দ্ব। তারপরও বাংলাদেশের জনগণ ভেবেছিলেন হয়তোবা জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতো তৃতীয় শক্তির রাজনৈতিক দল হিসেবে টিকে যাবে।
কিন্তু না, জাতীয় পার্টি তাদের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে আর দাঁড়াতে পারল না। এরশাদ এবং এরশাদ পরবর্তী সময়ে নিজেদের মধ্যে নানামুখী কলহ, খামখেয়ালি ও সঠিক বোঝাপড়ার অভাবে দলটি পতনের মুখে পড়ে। যেমন এরশাদ ছিলেন দলনেতা হিসেবে অতি আবেগপ্রবণ, তেমনি তার সহোদর জি এম কাদেরও নেতা হিসেবে অপরিণত। তারা দেশের কথা না ভেবে নিজের ইচ্ছামতো যখন যা মনে হয়েছে তাই করেছেন। অতি রোমান্টিক এরশাদ ক্ষমতায় বসে কবিতা লিখতে শুরু করেন। এরশাদের মৃত্যুর পর জাতীয় পার্টি বহুধা ভাঙনের মুখে পড়ে। একদিকে পার্টির হাল ধরেন বেগম রওশন এরশাদ, বিদিশা এরশাদ এবং অন্যদিকে জি এম কাদের ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মশিউর রহমান রাঙা, রুহুল আমিন হাওলাদার গংরা।

ভাবা হয়েছিল জি এম কাদের গংরা হয়তোবা জাতীয় পার্টিকে এই ভাঙনের মুখ থেকে টেনে তুলতে পারবেন। কিন্তু না, শক্তি, বুদ্ধিমত্তা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞার দিক থেকে জি এম কাদের আরও দুর্বল বিধায় তিনি দলকে একীভূত করতে পারেননি। ফলে জাতীয় পার্টির একসময়ের হেভিওয়েট মন্ত্রী ও পরিচিত স্বনামধন্য রাজনীতিবিদগণ বহুধা ভাঙনের কারণেই ২০২৬ এর ১৩তম জাতীয় নির্বাচনে প্রায় সকল আসনে প্রার্থী দিয়েও একটি আসনেও জয়লাভ করতে পারেননি। জাতীয় পার্টির আঁতুরঘর বা দুর্গ বলে পরিচিত বৃহত্তর রংপুরেও তাদের ভূমিধস হয়েছে, যা ছিল ভাবনার বাইরে। যেখানে জি এম কাদের নিজের ঘরের আসনেও জামানত খুইয়েছেন। অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জাতীয় পার্টি ভবিষ্যতে আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। বরং জাতীয় পার্টির চিরতরে সলিলসমাধি হলো এটিই সত্য বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ মনে করেন। একটি প্রভাবশালী দল, যা একসময় পরম পরাক্রমশালী ছিল, সে দলের মৃত্যু এত স্বল্প সময়ে হবে তা দেশের মানুষ তো নয়ই, খোদ রংপুরবাসীও হয়তো আশা করেননি। তবে জাতীয় পার্টির যে চিরতরে মৃত্যু হলো এ বিশ্বাস দেশের জনগণের মতো আমরাও দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি।

লেখক,কবি ও এ্যালবাম সম্পাদক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category