• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন

সৃষ্টিকর্তার প্রেম ও এক নিঃসঙ্গ পরিব্রাজক

এ.এইচ.এম. মুশিহুর রহমান / ১২৯ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

এত ভালোবাসার ভার বইতে পারছি না। হে রব, তুমি কীভাবে পারো? চোখের এত জল ধরে রাখতে পারছি না; কী দিয়ে বাঁধ দেব? বুকের ভেতরটা মিষ্টি মধুর চিনচিন করছে। কার সাথে শেয়ার করব? সবচেয়ে কাছের যে মানুষটি, তাকেও মনে হচ্ছে অনেক দূরে, পৃথিবীর আরেক প্রান্তে। কিছুতেই আমার অশ্রুভেজা ভালোবাসা পুরোপুরি তাকে ছুঁতে পারছে না; কিন্তু আমি যেন তার ভেতরটাও দেখতে পাচ্ছি। কীভাবে? আমি কি আমার ভেতরের পৃথিবী নিয়ে বাইরের পৃথিবী থেকে আলাদা কোনো কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছি? হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে মহান সৃষ্টিকর্তার অপার সৌন্দর্য, মহাকাশ থেকে বালুকণা পর্যন্ত, সৃষ্টিকর্তা থেকে পিঁপড়া পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছি; হৃদয়ের হাত দিয়ে ছুঁতে পারছি। সৃষ্টিকর্তা যেমন ভালোবেসে তাঁর সৃষ্টির সবকিছু গুটিয়ে তাঁর হৃদয়ে ধারণ করবেন, আবার ছেড়ে দেবেন। আমারও ইচ্ছে করে আমার ভালোবাসার মানুষগুলোকে সহ সবকিছুকে কলিজার সাথে বেঁধে রাখি, হাত দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনুভব করি।

আমার চারপাশের সব মানুষের, সবকিছুর একটি ফেস বা মুখ দেখতে পাই, যা দরদভরা, যন্ত্রণায় কাতর, ভালোবাসার কাঙাল; যা হৃদয়সাগরে মিষ্টি বেদনা ও ভালোবাসার ঢেউ তোলে। মনে হয় বুকের সঙ্গে চেপে ধরে ওর আনন্দ-বেদনার সঙ্গে বিলীন হয়ে যাই। কখনো মনে হয় আমি মাতাল, পৃথিবী আমার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সকলেই দূরে দাঁড়িয়ে হাসছে, তালি দিচ্ছে, মজা করছে। কখনো মনে হচ্ছে অনেক দূরের ভালোবাসার এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ থেকে সকলকে আমার দিকে ডাকছি, কিন্তু কেউ সাড়া দিচ্ছে না; বরং নেশাগ্রস্ত মনে করছে, মস্করা করছে।

আমি জানি সকলের আরও অনেক ফেস বা চেহারা আছে, কিন্তু কেন জানি বিশ্বাস হয় না। এমনকি রূঢ় বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়েও মন মানে না। তবে ভালোবাসার মানুষগুলো যখন পাল্টে যায়, জিঘাংসার দাঁতগুলো দেখাতে চায়, তখনও আমার বিশ্বাস হয় না; অবাক চোখে তাকিয়ে থাকি। মনে হয় এটাও বোধ হয় ভালোবাসার চরম রূপ। আঁকড়ে ধরে বলতে চায়, ‘তুমি শুধুই আমার। এখানে আর কারোরই ভাগ নেই।’

কখনো কখনো আমার নিজের পৃথিবী থেকে বের হয়ে এসে তোমার পৃথিবীতে দাঁড়াই। তোমার কারুকার্য, রং, অবয়ব বিন্যাস, প্রতিটি নড়াচড়া, প্রতিটি অবজ্ঞা, প্রতিটি বাঁকা চাহনি, প্রতিটি মুচকি হাসি ও প্রতিটি নালিশও যেন মনে হয় একটি রোমান্টিক নাটকের স্ক্রিপ্ট। তুমি যখন তোমার প্রিয় সাথিকে হঠাৎ ঘৃণা করছো, সহ্য করতে পারছো না, তখন আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি তোমাদের রোমান্টিক ছোট ছোট অংকগুলো, দৃশ্যগুলো। ভবিষ্যতের ছোট ছোট মিষ্টি স্বপ্নগুলো। ভালোবাসার চাদরে ঢাকা ছোট ছোট মুখগুলো, ছোট ছোট আবদারগুলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই যারা এতিম হয়ে যাবে, পৃথিবীটা শুষ্ক ও নির্মম হয়ে যাবে। নির্মম ক্ষুধা রক্তচক্ষু দেখাবে; বেওয়ারিশ হিসেবে পথে পথে ঘুরবে পরিচয়হীন হয়ে। একদিন কালের গর্ভে হারিয়ে যাবে আমাদের চক্ষুর আড়ালে। যখন মনে পড়বে, বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠবে। শুনতে পাব দূরে কোথাও দুঃখের সানাই বাজছে।

রাসেল, মুখটা তোমার মলিন কেন? কদিন আগেই তো দুজনে মিলে নতুন স্বর্গ রচনা করলে। সবাই মিলে কতই না আনন্দ করলাম। তোমার স্বামীহারা মায়ের চোখেমুখে যেন স্বপ্ন ও ভালোবাসা ঝরে ঝরে পড়ছিল। নিজের স্বামীর স্বর্গীয় মধুময় ভালোবাসার অভাব যেন তার পুত্রবধূকে ছুঁতে না পারে, তার জন্য কত পরিকল্পনা, কত আয়োজন! ঠারেঠোরে সকলকে শোনাচ্ছিল।

একদিনেই তোমার স্বপ্নগুলো হারিয়ে গেল? তোমার কাঁধের দুপাশে শক্ত হাত দুটি অসহায়ভাবে ঝুলে পড়ল? এত সুন্দর পৌরুষদীপ্ত চেহারাটি হারিয়ে গেল? তোমার মায়ের চেহারার দিকে তাকানো যাচ্ছে না। চোখের নিচে কালি পড়েছে। মুখের দুর্বোধ্য ‘মোনালিসার’ হাসিটা হারিয়ে গেছে। উদাস চোখে যেন কোনো সুদূরে কোনো এক স্বপ্ন খুঁজে বেড়াচ্ছে। তার পৃথিবীটা তোমাদের সঙ্গে সব যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে। কেন? কেন?

জানি না আঙ্কেল, কেন যে আমার স্বপ্নের ছবিগুলো তাকে ছুঁতে পারলো না। প্রতিদিন নানাভাবে আমার ভাবনাগুলোকে সাজিয়েছি তার স্বপ্নগুলোকে অনুভব করার জন্য, কিন্তু প্রতিদিনই দেখেছি আমার পৃথিবী থেকে তাকে ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে। আজ এত দূরে সরে গেছে যে ইচ্ছা করলেও ছুঁতে পারছি না। সে যেন কোনো অচেনা গ্যালাক্সির অচেনা একতারা। অথচ কত বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি স্বপ্ন দেখে, নিজেদের একটি ছোট্ট পৃথিবীর পরিকল্পনা করে, ছবি এঁকে। আজ আমি স্বপ্নের পৃথিবীহারা, সাথিহারা, প্রেমময় হৃদয়হারা; মহাশূন্যে হারিয়ে যাচ্ছি, যেখান থেকে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলেছি।

লেখক, বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজসেবক। ০১৭১১০১৬৮৭০

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category