• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন

অধ্যাপক ডা. জাকির হোসেন: সময়ের অকৃত্রিম কিংবদন্তি

নিজস্ব প্রতিবেদন / ১৪২ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

চিকিৎসা পেশাকে কেবল জীবিকা নয় বরং আর্তমানবতার সেবায় ব্রত হিসেবে গ্রহণ করার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন। একজন দক্ষ চিকিৎসক, গবেষক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর পরিচিতি যেমন আকাশচুম্বী, তেমনি একজন সমাজসংস্কারক হিসেবেও তিনি অনন্য। বগুড়া জেলার ধুনট উপজেলার শিমুলবাড়ি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই মানুষটি তাঁর মেধা ও মননকে নিবেদন করেছেন সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসুরক্ষায়। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে তিনি এক আশার আলো হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’-এর মাধ্যমে।
অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেনের চিকিৎসা জীবনের এক বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে শিক্ষা এবং গবেষণা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৮৫ সালে এমবিবিএস পাসের পর তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকে এফসিপিএস, এমডি, এফএসিপি এবং এফআরসিপির মতো উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ এবং শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা লুকিয়ে আছে সাধারণ মানুষের জন্য গড়া তাঁর কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে।
২০০৮ সালে রংপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার’ বর্তমানে উত্তরবঙ্গের চিকিৎসাসেবায় একটি মডেল হিসেবে দাঁড়িয়েছে। অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেন তাঁর পিতা-মাতার স্মরণে গঠিত ‘ওয়াসিম-ওয়ালেদা বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের’ অধীনে এই সেন্টারটি পরিচালনা করেন। আমাদের দেশে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে একটি ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়, যা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা খুবই কম। ডা. জাকির হোসেন কেবল রোগীদের চিকিৎসা দিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং এই রোগের ভয়াবহতা এবং প্রতিকার নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা তৈরিতে এক বিশাল বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে তিনি ‘প্রফেসর এসজিএম চৌধুরী মেমোরিয়াল অরেশন গোল্ড মেডেল’ লাভ করেন। এছাড়া উচ্চ রক্তচাপ নিয়ে তাঁর লেখা বই এবং দেশি-বিদেশি জার্নালে প্রকাশিত অর্ধশতাধিক গবেষণাপত্র চিকিৎসাবিজ্ঞানের ছাত্র ও গবেষকদের জন্য এক অমূল্য সম্পদ।
ডা. জাকির হোসেনের সামাজিক দায়বদ্ধতা কেবল চিকিৎসার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শিকড়ের টানে তিনি নিজ গ্রাম বগুড়ার ধুনটে গড়ে তুলেছেন একটি গণগ্রন্থাগার। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যখন বই পড়ার অভ্যাস কমে যাচ্ছে, তখন গ্রামের তরুণ ও সাধারণ মানুষের হাতে বই তুলে দেওয়ার এই উদ্যোগটি তাঁর সুদূরপ্রসারী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। একজন আদর্শবান সমাজসেবক হিসেবে তিনি বিশ্বাস করেন, কেবল শারীরিক সুস্থতা নয়, মানসিক সুস্থতা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক বিকাশও একটি সুন্দর সমাজের জন্য অপরিহার্য। তাঁর এই বহুমুখী অবদানের জন্য ২০২২ সালে তাঁকে সম্মানজনক ‘বাংলা একাডেমি ফেলোশিপ’ প্রদান করা হয়, যা একজন চিকিৎসকের জন্য বিরল সম্মান।
ডা. জাকির হোসেনের প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত জীবন ছিল নিরবচ্ছিন্ন সাধনায় ঘেরা। ১৯৮৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের উচ্চতর গবেষণায় নিজেকে নিবিড়ভাবে যুক্ত করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিয়েছেন। বিশেষ করে রংপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ এবং বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব উত্তরবঙ্গের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ২০২০ সালে দীর্ঘ সরকারি চাকরির ইতি টানলেও মানবসেবার ব্রত থেকে তিনি এক মুহূর্তের জন্যও বিচ্যুত হননি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে তাঁর পাণ্ডিত্য কেবল শ্রেণিকক্ষ বা হাসপাতালের ওয়ার্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি একজন সৃজনশীল লেখক এবং গবেষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর লেখা ‘রক্তচাপ ও উচ্চ রক্তচাপ’ বইটি সাধারণ মানুষের কাছে এক নির্ভরযোগ্য নির্দেশিকা হিসেবে সমাদৃত। দেশি এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত তাঁর ৪৫টিরও বেশি গবেষণাপত্র এবং শতাধিক সেমিনারে তাঁর জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের চিকিৎসকদের মেধার স্বাক্ষর বহন করে। বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষক এবং উচ্চতর মেডিকেল পরীক্ষার পরীক্ষক হিসেবে তিনি নতুন প্রজন্মের চিকিৎসক তৈরিতেও নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করছেন।
একজন গুণী মানুষের কর্মের স্বীকৃতি সমাজ ও রাষ্ট্র পরম মমতায় প্রদান করে। ডা. জাকির হোসেনের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ২০২২ সালে বাংলা একাডেমি ফেলোশিপের মতো বিরল সম্মাননা তাঁর সাহিত্যিক ও মননশীল কাজের এক অনন্য স্বীকৃতি। এছাড়া ২০২৩ সালে প্রাপ্ত প্রফেসর এসজিএম চৌধুরী মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল এবং কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ সম্মাননা তাঁর নিরলস গবেষণারই ফসল। তিনি কেবল রোগ নির্ণয় করেন না, বরং একটি সুস্থ সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখেন।
তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত মানুষের নিরঙ্কুশ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা। রংপুরের হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারটি কেবল একটি চিকিৎসালয় নয়, এটি বর্তমানে উত্তরবঙ্গের হাজারো মানুষের ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত গণগ্রন্থাগার এবং বাবা-মায়ের নামে গড়া ওয়াসিম-ওয়ালেদা বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি শিক্ষার আলো ও মানবিক সহায়তা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। অধ্যাপক ডা. মো. জাকির হোসেনের এই বর্ণাঢ্য জীবন প্রমাণ করে যে, শেকড়কে ভুলে না গিয়েও কীভাবে আন্তর্জাতিক মানের মেধা ও মনন দিয়ে আর্তমানবতার সেবা করা যায়। তিনি আমাদের সময়ের একজন প্রকৃত কিংবদন্তি, যাঁর প্রতিটি কাজ আগামী দিনের সমাজসেবকদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category