• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন

রাষ্ট্র নায়ক হযরত মুহাম্মদ সা.

 মো: আব্দুল মতিন খন্দকার / ১০৩ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

মহানবীর আগমন বিশ্বের ইতিহাসে একটি অনন্য ঘটনা। তাঁর জীবন সমুদ্রকে কোন একটি বিশেষ দিক থেকে বিচার করলে সঠিক মূল্যায়ন হওয়া তো দুরের কথা,বরং বিভ্রান্তি হতে পারে। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন, আধ্যাত্মিক জীবন,নবুওয়াত পূর্ব জীবন ও নবুওয়াত পরবর্তী জীবন প্রভৃতির সমন্বয়ই মহানবী। অর্র্থাৎ এগুলো পরস্পর সম্পৃক্ত (ওহঃবৎৎবষধঃবফ) এবং অবিভাজ্য (টহফরারফবফ)। তিনি আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন (ঈড়ফব ড়ভ ষরভব) মানব জাতির কল্যাণের জন্য নিয়ে আসেন। তাঁকে কোন নির্দিষ্ট অঞ্চল ও ভাষাভাষি লোকদের জন্য প্রেরণ করা হয়নি। তিনি ছিলেন সমগ্র মানব জাতির আর্শীবাদ। “আমি রাসূলকে সমস্ত সৃষ্টির রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছি” “আল-কুরআন”
আল্লাহ তায়ালা রেসালতের দায়িত্ব দিয়ে যুগে যুগে পথভোলা মানুষকে সঠিক পথের সন্ধান দেয়ার জন্য যে সমস্ত  মহাপুরুষকে মনোনীত করে ছিলেন তাঁরা ছিলেন মানুষ। অর্থাৎ প্রতিটি নবীই মাতৃগর্ভে ও পিতার ঔরষে জন্ম নিয়ে ছিলেন। সুখ-দুঃখ,ক্ষুধা-তৃষ্ণা,শীত-গরম,কাম-ক্রিয়া,সবকিছুই তাঁদের বিদ্যমান ছিল। তা না হলে তাঁদের অনুসৃত জীবন বিধান মানুষের পক্ষে পালন করা অসম্ভব হত। সে জন্য আল্লাহ বলেছেন; আমি একজন রাসূল প্রেরণ করেছি। তিনি (মানুষ) তোমাদেরই একজন। তোমাদের জন্য কষ্ট হবে এমন কোন কিছুই তাঁর কাম্য নয়। তোমাদের কল্যাণেই তার কাম্য।
মহানবী (সাঃ) ৬১০ খ্রিঃ  যে নবুওয়াত লাভ করেন তা কোন রাজনৈতিক শ্লোগান ছিল না,তথাপি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই তাঁকে সবচেয়ে বেশী বাধা দিয়েছিলেন। কারণ তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতাচ্যুতির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত তাঁরা কালেমার দাওয়াতে পেয়েছিলেন। মহানবী যে কালেমার প্রচার করেছিলেন তা ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার ভিত্তি। অতএব বিরোধীতা ছিল অবসম্ভাবী।
৬২২ খ্রিঃ মহানবী সা. যখন আল্লাহর নির্দেশে মদীনায় হিজরত করলেন তখন তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে মনিষী ওয়াট মন্তব্য করেছেন। “ঙহ ঃযব ৎবষরমরড়ঁং ংরফব রভ (ঐরুৎধঃ)সবধহঃ ঃযব ধপপবঢ়ঃধহপব ড়ভ গঁযধসসধফ ধং চৎড়ঢ়যবঃ, ধহফ ড়হ ঃযব  ঢ়ড়ষরঃরপধষ ংরফব ঃযব ধপপবঢ়ঃধহপব ড়ৎ যরস ধং ধৎনরঃবৎ নবঃবিবহ ঃযব ড়ঢ়ঢ়ড়ংরহম ভঁহপঃরড়হ রহ গধফরহধ.
মনিষী ওয়াটের এই মন্তব্যটির যথার্থতা আমরা দেখতে পাই পযধৎঃবৎ ড়ভ গধফরহধ বা মদীনার সনদ প্রণয়নে। ৬২৪ খ্রিঃ মহানবীর এই সনদ ৫৩টি ধারায় স্পষ্টভাবে লিখিত ছিল। এই সনদে আইনের শাসন (জঁষব ড়ভ খধ)ি ধর্মের স্বাধীনতা, ধর্মীও সহিষ্ণুতা এবং সহ-অবস্থানের অধিকার স্বীকৃত হয়েছিল তাহা ১২১৫ খ্রিঃ ম্যাগনা কার্টার চেয়ে অনেক বেশী শ্রেষ্ঠত্বের দাবী করতে পারে। এই মহা সনদ পৃথিবীর প্রথম লিখিত সংবিধান (ঋরৎংঃ ৎিরঃঃবহ ঈড়হংঃরঃঁঃরড়হ ড়ভ ঃযব ড়িৎষফ) হিসেবে স্বীকৃত। এই সনদই হযরত মুহাম্মদ সা. রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও তার দুরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।
আল্লাহর রাব্বুল আলা আমিন মানুষকে সৃষ্টি করে তাদের জীবন প্রণালী প্রেরণ করেছেন। তিনি শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)কে যে মহান দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার তাৎপর্য তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। “ আমি রাসূলকে সত্য দ্বীন এবং হেদায়েত সহ প্রেরণ করেছি। তিনি এই দ্বীনকে বিজয়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠত করবেন। যদিও কাফেররা তাহা পছন্দ করে না।
মহানবীর এই দাওয়াত যারা গ্রহণ করেন তারা একটি উম্মতে বা দলে পরিনত হন। এই দলের দায়িত্ব,কর্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন “ তোমরা শ্রেষ্ঠ জাতি, তোমাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে মানব জাতির কল্যাণের জন্য। তোমরা মানুষকে সৎ পথের আদেশ দিবে এবং অসৎ পথ থেকে বিরত রাখবে।” এভাবে রাসূল আল্লাহর নেতৃত্ব যে মুসলিম জাতির সৃষ্টি হয়েছিল তার উপর অর্পন করা হয়েছে দু’টি মহান দায়িত্ব যা রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া সম্ভব নয় তা হল ‘নির্দেশ দেয়ার’ ও ‘বিরত রাখার’। মদিনার মহাসনদে র ভিত্তিতে যে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের উদ্ভব হল রাসূলুল্লাহ ছিলেন তার প্রথম রাষ্ট্র প্রধান।
বর্তমানে অনেকে ইসলামী রাষ্ট্রকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্ররূপে আখ্যায়িত করে ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র (ঝবপঁষবৎ ঝঃধঃব) প্রতিষ্ঠাই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে করে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে দেখা যায় যে, অনেক অমুসলিম রাষ্ট্র মদিনা সনদের ভিত্তিতে ইসলাশী রাষ্ট্রের সদস্য হয়েছিল। যেমন, (১) তাইন এর শাসন কর্তা ছিলেন ইহুদী (২) আয়লা এর শাসনকর্তা ছিলেন খৃষ্টান, (৩) দওয়াতুল জন্দল এর শাসনকর্তা ছিলেন খৃষ্ঠান। (৪) নাজরান এর শাসনকর্তা ছিলেন খৃষ্টান। এই সমস্ত রাষ্ট্রে তারা নিজ নিজ ধর্মানুযায়ী শাসন করেও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সদস্য হতে পেরেছিলেন। অতএব মহানবী শান্তিপূর্ণ সহঅবস্থানের (চবধপবভঁষ পড়-বীরংঃবহপবং ) যে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন তা আজও বিরল।
সাধারণতঃ পাশ্চাত্য পন্ডিতগন মনে করেন যে, রাসূলের যুগে ইসলামী রাষ্ট্রের সঠিক কোন প্রশাসনিক কাঠামো (অফসরহরংঃৎধঃরাব ংঃৎঁপঃঁৎব) ছিল না। পারস্য ও রোম বিজয়ের ফলে মুসলমানরা তথাকার প্রশাসনের সঙ্গে পরিচয় লাভ করে এবং নিজেরা গ্রহণ করে কিন্তু এই ধারণা অমূলক এবং মূর্খতা প্রসুতও বটে। একটি প্রগতিশীল রাষ্ট্রের তিনি যে উদ্দোক্তা  তার প্রমাণ হাদীস ও সীরাত গ্রন্থ সমূহে পাওয়া যায়। তাঁর প্রশাসনের একটু আলোচনা করা যাক।
রাষ্ট্র প্রধান (চৎবংরফবহঃ)
প্রশাসনিক সংস্থার সর্বেŸাচ্চ পদ হচ্ছে রাষ্ট্র প্রধান। রাসূল ছিলেন আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত তাই নির্বাচনের প্রশ্ন ছিল অযৌক্তিক। কিন্তু পরবর্তীকালে নির্বাচন ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচিত হতেন। রাষ্ট্র প্রধান যাতে স্বেচ্ছাচারী হতে না পারেন সেজন্য কুরআনে বলা হয়েছে “তুমি শাসন কার্যের ব্যাপারে তাদের সহিত পরামর্শ কর” ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান একজন সাধারণ নাগরিকের  অধিকার ভোগ করতেন। তাঁর বিরুদ্ধেও আদালতে অভিযোগ আনা যেত।
মন্ত্রি পরিষদ (গরহরংঃৎু)
সাধারণত: যারা রাষ্ট্র প্রধানকে মন্ত্রণা বা পরামর্শ দেন তাঁদেরকেই মন্ত্রি নামে অভিহিত করা হয়। রাসূল নিজেই বলেছেন আমার পৃথিবীবাসী দুজন পরামর্শদাতা হযরত আবু বকর (রাঃ) ও হযরত ওমর (রাঃ) হযরত যে কোন ব্যাপারেএই দু’জনের নিকট বিশেষভাবে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এরা ইসলামী রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
গভর্ণর (এড়াবৎহড়ৎ)
মহানবী বিভিন্ন প্রদেশে প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিয়োগ করেছিলেন। বাযান ইবনে মাযানকে ইয়ামেনের, খালেদ বিন সাঈদ আল উমরীকে নাজরান, জিয়াদ ইবনে লবীদ আনসারীকে হাজরামাওতের শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন।
মজলিসে সুরা বা পরামর্শ পরিষদ :
আনসার ও মুহাজের এর মধ্যে হইতে তিনি বিশিষ্ট নাগরিকগণকে লইয়া পরামর্শ পরিষদ গঠন করেছিলেন। যে কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথা যুদ্ধ, সন্ধি, নিয়োগ, বদলী প্রভূতি বিষয়ে মহানবী পরামর্শ করতেন এবং অধিকাংশের মতামত গ্রহণ করতেন।
এ সমস্ত ছাড়াও মহানবী সৈন্য বিভাগ, বিচার বিভাগ, লিপিকার বিভাগ, গোপন চিঠিপত্র ও অনুবাদ বিভাগ, হিসাব বিভাগ ও নিরাপত্তা বিভাগ প্রভূতির প্রণেতা।
বিশ্বনবী যে প্রশাসনিক কাঠামো এবং সংস্থা সমূহ সৃষ্টি করেছিলেন পরবর্তীকালে মুসলিম বিজয়ের ফলে তাহা বিশ্ববাসীর নিকট পরিচিত হয় এবং বর্তমান যুগে এসে সংস্কার ও উন্নতি লাভ করে।
 লেখক, সাবেক অধ্যক্ষ, বোনারপাড়া সরকারি কলেজ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category