• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫৪ অপরাহ্ন

ত্রিপুরার রঘুনন্দন পাহাড়ের ঊনকোটি: এক রহস্যময় রক আর্ট

অর্ণব আশিক / ৮৯ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

আমার প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ, ঋতু বৈচিত্র্যের অসাধারণ সৌন্দর্যের দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশের নদী বৈচিত্র্য ও সমুদ্রসৈকত। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের অনন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপরূপ লীলাভূমি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি। আমাদের এই মাতৃভূমির মুক্তিযুদ্ধের সময় আগরতলাবাসীর অবদান আমরা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করি।

তৎকালীন বঙ্গদেশের সাথে ত্রিপুরার ছিল ঐতিহাসিক সম্পর্ক। ত্রিপুরার ভৌগোলিক অবস্থান অদ্ভুতভাবে গাঁথা বাংলাদেশের সঙ্গে। ভারতের অন্যান্য অংশ যেখানে একদিক থেকে বেঁধে রেখেছে, সেখানে বাংলাদেশ তিন দিক থেকে আলিঙ্গন করে আছে ত্রিপুরাকে। ত্রিপুরার ৯১৭ কিলোমিটার সীমান্তের ৮৩৯ কিলোমিটারই বাংলাদেশের সঙ্গে।

ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ। আগরতলা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ক্ষুদ্র রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী, বাংলাদেশের সীমান্তঘেঁষা ভারতীয় রাজ্য। কিন্তু যাওয়া হয়নি কোনোদিন। গত ২৪ এপ্রিল ২০২৩ আগরতলা ভ্রমণে যেয়ে দেখা হয়ে গেল আগরতলা। ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাপনে আগরতলা ও বাংলাদেশের মানুষের অসম্ভব মিল। আগরতলা ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার। প্রসঙ্গে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের—

“বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে/বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে/দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,/দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/একটি ধানের শিষের উপরে/একটি শিশিরবিন্দু।”

ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা ঘুরতে যাওয়া হয়নি কখনো। ঊনকোটি তো কখনোই যাওয়া হয়নি। এবার আগরতলা ঘুরতে যেয়ে দলছুট হয়ে দেখে এলাম আগরতলা থেকে ১৮৫ (একশত পঁচাশি) কিমি দূরে রঘুনন্দন পাহাড়ে প্রাচীন শিল্প নিদর্শন ‘ঊনকোটি’।

ঊনকোটি তেমনই একটি প্রাচীন রক শিল্পের ক্ষেত্র। যার অবস্থান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উত্তর-পূর্ব অংশে, কৈলাসহর থেকে প্রায় ৮ (আট) কিলোমিটার এবং রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে ১৮৫ কিলোমিটার।

রক আর্ট বা শিলা শিল্প হলো মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন নান্দনিক শিল্প। চুনাপাথর, বেলেপাথর, স্টিয়েটাইট, ক্যালসাইট, জিপসাম, আলাবাস্টার, গ্র্যানাইট, মার্বেল বা জেড পাথরের ওপর আমাদের পূর্বপুরুষেরা কখনও এঁকেছে ছবি। যেখানে ছবি আঁকা সম্ভব নয় সেখানে পাথর কুঁদে বানিয়েছে নানান অবয়ব। সময় লেগে যেত কয়েক যুগ থেকে কয়েকশো বছর। একজনের শুরু করা খোদাই অনেক ক্ষেত্রেই শেষ হতো কয়েক প্রজন্ম পরের শিল্পীর হাতে। (রূপাঞ্জন গোস্বামী)

ঊনকোটি তেমনই একটি প্রাচীন শিল্প নিদর্শন। বিশ্বের নব্বই শতাংশ পর্যটক খবরই রাখেন না, ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রক আর্ট গ্যালারি, ঊনকোটি আজও অবহেলায় পড়ে আছে ত্রিপুরা রাজ্যের দুর্গম রঘুনন্দন পাহাড়ে। কোনো এক রহস্যজনক কারণে ত্রিপুরার এই অভূতপূর্ব শিল্পকর্ম সম্বন্ধে এক কলমও লিখে রাখেনি ইতিহাস। বিশ্বের প্রায় সব রক আর্টের নিখুঁত সময়কাল ও প্রেক্ষাপটের কথা জানা গেলেও, এই রক আর্ট গ্যালারিটির সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায়নি। তাই আজও রহস্যের কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে উত্তর ত্রিপুরার রঘুনন্দন পাহাড়ের ঊনকোটি (টহধশড়ঃর)।

প্রত্নতত্ত্বে, রক আর্ট হলো মানুষের তৈরি চিহ্ন যা প্রাকৃতিক পৃষ্ঠে, সাধারণত উল্লম্ব পাথরের পৃষ্ঠে পাথর কেটে শিল্প স্থাপন করা হয়। ঐতিহাসিক এবং প্রাগৈতিহাসিক শিলা শিল্পের একটি উচ্চ অনুপাত গুহা বা আংশিকভাবে ঘেরা শিলা আশ্রয়ে পাওয়া যায়; এই ধরনের কেভ আর্ট বা প্যারিটাল আর্টও বলা যেতে পারে।

রক আর্ট বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পাওয়া গিয়েছে। মানব ইতিহাস জুড়ে এই রক আর্ট মানুষের প্রাচীন শিল্পকর্মকে বর্তমানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। গবেষকদের মতে রক আর্টের চারটি প্রধান গ্রুপ হলো:
১. গুহা চিত্র, ২. পেট্রোগ্লিফ (যা পাথরের পৃষ্ঠে খোদাই করা বা স্ক্র্যাচ করা হয়), ৩. ভাস্কর্য করা শিলা এবং ৪. জিওগ্লিফ (মবড়মষুঢ়যং) (যা মাটিতে গঠিত হয়)।

ফ্রেমন্ট পেট্রোগ্লিফ, ডাইনোসর জাতীয় স্মৃতিসৌধে, ক্লাসিক ভার্নাল স্টাইলের জন্য দায়ী, ফ্রেমন্ট প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্কৃতি, পূর্ব উটাহ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র; শ্রীলঙ্কার গাল বিহারে শুয়ে থাকা বুদ্ধ, যেখানে দুটি স্তম্ভের অবশিষ্টাংশ দেখা যাচ্ছে যে কাঠামোটিকে সমর্থন করার জন্য এটি মূলত ঘেরা ছিল; নানাবোজো ছবি, মাজিনাউ রক, বন ইকো প্রভিন্সিয়াল পার্ক, অন্টারিও, কানাডা। ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া এবং আফ্রিকায় পাওয়া প্রাচীনতম রক শিল্পটি উচ্চ প্যালিওলিথিক যুগের।

রক আর্ট সম্পর্কে অধ্যয়নরত নৃবিজ্ঞানী বা গবেষকরা বিশ্বাস করেন যে নানাবোজো ছবি, মাজিনাউ রক, বন ইকো প্রভিন্সিয়াল পার্ক, অন্টারিও, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, এশিয়া এবং আফ্রিকায় পাওয়া প্রাচীনতম রক শিল্পটি উচ্চ প্যালিওলিথিক যুগের। এই শিল্পকর্ম নিয়ে অধ্যয়নরত নৃবিজ্ঞানীরা মনে করেন যে তাদের সম্ভবত জাদু-ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পশ্চিম ইউরোপের কিছু অংশের গুহা ব্যবস্থায় পাওয়া উচ্চ প্যালিওলিথিকের রক শিল্প অধ্যয়নরত ফ্রাঙ্কোফোন পণ্ডিতদের মধ্যে রক আর্ট অধ্যয়নের প্রত্নতাত্ত্বিক উপ-শৃঙ্খলা প্রথম বিকাশ লাভ করে। বিশ্বের বিভিন্ন অংশে আদিবাসীদের কাছে রক শিল্পের গুরুত্ব রয়েছে, যারা তাদেরকে পবিত্র বস্তু এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উল্লেখযোগ্য উপাদান হিসেবে দেখে।

তবে নান্দনিকতার দিক থেকে রক আর্টে সেরা ছিলেন ভারতীয়রা। এছাড়া সহায়ক ভূপ্রকৃতির জন্য প্রাচীনকাল থেকেই ভারত ছিল ভাস্করদের স্বর্গরাজ্য। তাই তো ভারতের অজন্তা, ইলোরা, খাজুরাহো, এলিফ্যান্টা, বিদিশার উদয়গিরি গুহা, বাদামি গুহা, বরাহ গুহা, মহিষমর্দিনী মণ্ডপ, পুরী মন্দির, কোনারকের সূর্য মন্দির, ধর্মশালার কাংড়া দুর্গসহ আরও শত শত রক আর্ট দেখার জন্য সারা বিশ্ব থেকে আজও ছুটে আসেন লক্ষ লক্ষ পর্যটক। এই ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলি সাংস্কৃতিক পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে আজকাল।

ঊনকোটি পাহাড়ের উল্লম্ব পৃষ্ঠটি প্রাচীন লোকেরা বিভিন্ন পৌরাণিক দৃশ্য যেমন শিব, গণেশ, উমা-মহেশ্বর ইত্যাদির বিভিন্ন মূর্তিচিত্র খোদাই করতে ব্যবহার করত। ঊনকোটি হিন্দু দেবতাদের চিত্রিত বিশাল পাথর কাটা প্যানেলের জন্য বিখ্যাত। ঊনকোটি অষ্টম-নবম শতাব্দী সিই থেকে ত্রিপুরায় প্রাচীন শৈব উপাসনার প্রমাণ প্রদান করে।

ঊনকোটি স্থানটি বহুকাল ধরে শৈব উপাসনার সাথে যুক্ত একটি প্রাচীন পবিত্র স্থান হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত। ঊনকোটির বেস রিলিফ ভাস্কর্যগুলি অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীতে, প্রাক-মাণিক্য শাসনের সময়কালের শৈলীগত ভিত্তিতে তৈরি। শ্রীভূমির ‘দেব’ প্রজন্মের দ্বারা শিলা শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা থাকতে পারে। ভগবান শিবের স্থান হিসেবে ঊনকোটির প্রথম সাহিত্যের উল্লেখ পাওয়া যায় এ. কে. চৌধুরী (১৯১০-১১) এবং ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসের (১৯১৪) রচনায়। (ক্যাপ্টেন উইলিয়ামস ছিলেন ত্রিপুরায় তৎকালীন ব্রিটিশ রাজনৈতিক এজেন্ট।) ১৯২১-২২ সালের ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ঊনকোটির ওপর একটি প্রামাণিক বিবরণ প্রকাশ করেছে।

ব্যুৎপত্তিগতভাবে ঊনকোটি মানে ‘ঊন’ অর্থ এক কম এবং ‘কোটি’ অর্থ কোটি। তাই সাইটটির নাম ‘ঊনকোটি’ আক্ষরিক অর্থে “এক কোটির কম” হিসেবে অনুবাদ করা হয়েছে। ঊনকোটি নিয়ে অনেক কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। তার একটি কিংবদন্তি অনুসারে, ঊনকোটি ছিল দেব-দেবীদের মিলনস্থল যেখানে তারা মথুরার কাছে আরেকটি বৃন্দাবন তৈরির অভিপ্রায়ে শুক্লা অষ্টমী (চৈত্র মাসের চন্দ্র পাক্ষিকের ৮ম দিন) তিথিতে একত্রিত হয়েছিল।

ভগবান শিব তাঁর সঙ্গীদেরকে তাঁদের যাত্রা পুনরায় শুরু করার জন্য সূর্যোদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। সকালে স্বয়ং শিব ছাড়া আর কেউ ঘুম থেকে উঠতে পারেনি। তাই শিব তাদেরকে পাথরে পরিণত হওয়ার অভিশাপ দিয়েছিলেন। রঘুনন্দন পাহাড়ে আসা এক কোটি দেবতার মধ্যে ৯৯ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৯৯ জন দেবদেবী সেই ভোরে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলেন পাথরের মূর্তিতে। একমাত্র মহাদেব এগিয়ে গিয়েছিলেন কাশীর দিকে। সেই দিন থেকে জায়গাটির নাম হয়ে গিয়েছিল ঊনকোটি (টহধশড়ঃর)। শব্দটির অর্থ এক কোটির থেকে এক কম।

এমন আর একটি লোকগাথায় আছে—বহুকাল আগে এই অঞ্চলে বাস করতেন কালু নামে এক কুমোর। তিনি ছিলেন শিব ও পার্বতীর বড় ভক্ত। একসময় তাঁর জীবনে এসেছিল বৈরাগ্য। সংসার ছেড়ে রঘুনন্দন পাহাড়ের এক গুহায় তিনি শুরু করেছিলেন শিবের আরাধনা। কেটে গিয়েছিল কয়েক যুগ।

এক সন্ধ্যায় তপস্যায় মগ্ন ছিলেন কালু। সহসা কানে ভেসে এসেছিল পায়ের আওয়াজ। কালুকে বিস্মিত করে গুহায় প্রবেশ করেছিলেন শিব ও পার্বতী। দর্শন পেয়ে আরাধ্য দেবতার পায়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন কালু। বলেছিলেন তাঁর কোনো বরের প্রয়োজন নেই। কারণ ইহজগত থেকে তাঁর মন উঠে গিয়েছে। তিনি তাই বাবা ভোলানাথের সঙ্গে কৈলাশে চলে যেতে চান। কিন্তু কালুর প্রার্থনা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন মহেশ্বর। কালুকে বলেছিলেন কৈলাশ মানুষের জন্য নয়, সে স্থান একান্তই দেবদেবীদের। তখন কালু দেবী পার্বতীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে মিনতি করেছিলেন। কালুর হয়ে মহাদেবকে অনুরোধ করেছিলেন পার্বতী। মহাদেব দিয়েছিলেন একটি শর্ত। সেই রাতের মধ্যে রঘুনন্দন পাহাড়ের পাথর কুঁদে কালুকে বানিয়ে দিতে হবে এক কোটি দেবদেবীর মূর্তি। তবেই কালু পাবে কৈলাশে যাওয়ার অনুমতি।

সেই সন্ধ্যাতেই রঘুনন্দন পাহাড়ের পাথর কাটতে শুরু করেছিলেন কালু। কেটে যাচ্ছিল প্রহরের পর প্রহর। নিদ্রাহীন কালুর ছেনি হাতুড়ির আঘাতে রঘুনন্দন পাহাড়ের গায়ে ফুটে উঠছিল শিব-পার্বতীসহ একের পর এক দেবদেবীর অবয়ব। কনকনে শীতের রাতেও কালুর শরীর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছিল ঘাম। ভোর হয়ে আসছিল। তখনও একটি মূর্তি বানানো বাকি। পশুপতিনাথের মায়ায় ভারী হয়ে এসেছিল কালুর চোখের পাতা। হিমশীতল পাথরের ওপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিল ক্লান্ত কালু। তাই এক রাতের মধ্যে ৯৯ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯৯৯টি মূর্তি বানিয়ে ফেলেও শেষরক্ষা হয়নি। কৈলাশ যেতে পারেননি কালু কুমোর।

কিংবদন্তি যদিও শুধুমাত্র প্রচলিত বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে চলমান। ঊনকোটির শিলা খোদাইগুলি পশ্চিমমুখী এবং একটি সুন্দর ল্যান্ডস্কেপে অবস্থিত যেখানে সবুজ গাছপালা রয়েছে এবং পাহাড়ের মধ্য অংশে পূর্ব-পশ্চিম দিকে নিচের দিকে প্রবাহিত একটি স্রোত রয়েছে। স্রোতধারা নিচে তিনটি কুণ্ড গঠন করে। এই কুণ্ডগুলি ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের অধীনে ধর্মীয় অনুশীলনের জন্য পবিত্র ছিল এবং ঊনকোটিতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক অশোকাষ্টমী মেলার একটি বড় অংশ।

ঊনকোটিতে পাওয়া চিত্রগুলিকে দুটি বিভাগে শ্রেণীবদ্ধ করা যেতে পারে:
ক) পাহাড়ের উল্লম্ব পৃষ্ঠের রাজকীয় পাথর কাটা ছবি এবং পতিত পাথর এবং
খ) পাহাড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট এবং মাঝারি আকারের আলগা ভাস্কর্য।

ঊনকোটির সবচেয়ে কেন্দ্রীয় এবং সুস্পষ্ট ব্যক্তিত্বটি ‘ঊনকোটীশ্বর কাল ভৈরব’ নামে পরিচিত। শিবের বিশাল শিলা-কাটা মূর্তিটি প্রায় ৩০ (ত্রিশ) ফুট উচ্চতায়। তৃতীয় চোখটি কপালে উল্লম্বভাবে চিত্রিত করা হয়েছে এবং অন্য দুটি চোখ কোনো মণি ছাড়াই ডবল ছেদযুক্ত রেখা দিয়ে নির্দেশিত। মুখের সাথে সোজা নাককে দাঁতের প্রতিনিধিত্বকারী উল্লম্ব রেখাসহ একটি সরু চেরা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। মুখের ওপরে একটি ছেদযুক্ত রেখা রয়েছে যা একটি লুপে পরিণত হয় যা একটি গোঁফকে চিত্রিত করে। একটা বিষয় লক্ষণীয়—হেডগিয়ার এবং কানের অলঙ্কারগুলিতে উপজাতীয় শিল্পের প্রভাব দেখা যায়। চিত্রটিতে কিছুটা ক্ষয় দেখা যায়, সম্ভবত এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাত এবং ঘন ঘন ভূমিকম্পের কারণে। এমনটা হতে পারে। এই ছবিটির বাম দিকে কিছু দূরত্বে একটি ত্রিশূল খোদাই করা হয়েছে।

শিবের মূর্তির কাছাকাছি, নন্দীর তিনটি চিত্র (শিব পর্বত) এবং শিবের মূর্তির উপরে পাথরের পৃষ্ঠে দুটি মহিলা মূর্তি দেখা যায়।
বামদিকের চিত্রটি একটি সিংহের উপর দাঁড়িয়ে আছে এবং দেবী দুর্গা হিসাবে চিহ্নিত। গঙ্গাধরা হিসাবে শিবের আরেকটি বিশাল রক-কাটা মূর্তি, অ্যাপ্রোচ-ওয়ের ডানদিকে অবস্থিত। ছবিতে শিবের মাথা ও আবক্ষ মূর্তি দেখা যাচ্ছে। শিবকে চিত্রিত করা হয়েছে দু’টি স্বাভাবিক চোখ এবং তৃতীয়টি তার কপালে।

ছবিটির দু’পাশে জটা দেখা যাচ্ছে, যা দড়ির মতো নকশায় নিচে পড়ে আছে। তার কপালে একটি টিয়ারার মতো অলঙ্কার খোদাই করা আছে। দুটি বৃত্তাকার কুণ্ডল (কানের দুল) তার কানের নীচের অংশে শোভা পায়। গঙ্গাধরা শিবের পাশে, আরও উত্তরে প্রায় ২ (দুই) মিটার দূরত্বে, উল্লম্ব পৃষ্ঠে আরও একটি শিবের মূর্তি খোদাই করা হয়েছে। মুখটি তিনটি চোখসহ চিত্রিত করা হয়েছে, একটি মুখ সারি সারি দাঁত বহন করে এবং কপালে একটি টিয়ারার মতো অলঙ্কার রয়েছে।

বিপরীত তীরে স্রোত অতিক্রম করার পরে, একই টিলার আরও একটি শিব মূর্তি খোদাই করা হয়, যার একই রকম মূর্তিবিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য যেমন জটামুকুট, মুকুট, তিনটি চোখ, পাতলা ছেঁড়া ধনুকের আকৃতির ভ্রু, প্রশস্ত খোলা মুখ, একটি লম্বা গলা। লম্বা কান একটি বৃত্তাকার পুষ্পশোভিত কুণ্ডল।

মুকুটের চরম বাম দিকে, দেবী দুর্গাকে একটি বাঘের উপর এবং ডান দিকে দাঁড়িয়ে চিত্রিত করা হয়েছে; একটি কুমিরের উপর দাঁড়িয়ে গঙ্গা নদীকে চিত্রিত করা হয়েছে। এখানে মূলত তাদের তপস্যার মনোভাব দেখানো হয়েছে। এই শিব মূর্তির আরও উত্তরে, একটি পাথরের নীচের ঢালে, একটি ধনুক এবং তীর ধারণ করা একটি পুরুষ মূর্তি খোদাই করা হয়েছে। তাকে তার বাম পা সামনের দিকে প্রসারিত করে একটি মৃদু নড়াচড়ায় চিত্রিত করা হয়েছে এবং তার সাথে একটি মহিলা চিত্র রয়েছে, তাকে তার পিছনে দাঁড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

কিরাতা ও কিরাতীর ছদ্মবেশে এই ছবিগুলোকে শিব ও পার্বতী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিরাতা মূর্তিটির উপরে, পাহাড়ের পৃষ্ঠের উপরের অংশে দুটি পুরুষ মূর্তি খোদাই করা হয়েছে। জটা (চুলের তালা) এবং কপালে তৃতীয় চোখসহ চিত্রটি শিবের হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার কাঁধের ঠিক উপরে, দ্বিতীয় মানব মূর্তিটি দেখানো হয়েছে, শিবের দিকে একটি তীর রেখে। এই দৃশ্যটি ‘কামদহন’ পর্ব হিসেবে দেখানো হয়েছে।

সিঁড়িতে উপরের দিকে গেলে, একটি শিবলিঙ্গের চিত্র এবং তুলনামূলকভাবে ছোট স্কেলগুলিতে খোদাই করা শিবের মাথার সাথে শিলা-কাটা পুরুষ এবং মহিলা মূর্তিগুলির একটি সিরিজ দেখা যায়। এছাড়াও চিত্রিত করা হয়েছে একটি প্রাণীর একটি চিত্র যেখানে একটি মহিলার মুখ রয়েছে, যাকে কিছু পণ্ডিত কামধেনু হিসাবে চিহ্নিত করেছেন।

স্রোতের একটু নীচে, পশ্চিম দিকে, অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের তিনটি বিশাল গণেশের মূর্তি নিয়ে খোদাই করা একটি প্যানেল। এই দলটি পাহাড়ের চরম বাম দিকে উপবিষ্ট গণেশ (৭ মিটার বা ২২ ফুট উচ্চতা) নিয়ে গঠিত এবং তার ডানদিকে আরও দুটি হাতির মাথাওয়ালা দেবতা রয়েছে। দাঁড়িয়ে থাকা হাতির মাথাওয়ালা ছবিগুলি উপবিষ্ট গণেশের প্রতিমূর্তি থেকে ইকনোগ্রাফিকভাবে আলাদা। এদেরকে দাঁড়ানো অবস্থায় চিত্রিত করা হয়েছে এবং তাদের যথাক্রমে কোমর, তিন-চারটি দাঁত এবং ছয় এবং আটটি হাত রয়েছে। উপবিষ্ট গণেশের মূর্তিটি একটি প্রসারিত পেট, একটি দাগ এবং চারটি হাতসহ দেখানো হয়েছে।

অনেক গবেষক ও পণ্ডিতদের মতে, হাতির মাথাওয়ালা দুটি দণ্ডায়মান দেবতার চিত্রে তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের প্রভাব দেখা যায়। একেবারে ডানদিকে বিষ্ণুর একটি মূর্তি যেখানে চারটি আয়ুধ রয়েছে। গণেশ প্যানেল থেকে প্রায় ১০০ (একশত) মিটার, স্রোতটি দক্ষিণে মোড় নেয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে আরেকটি নদীর সাথে মিলিত হয়। এই সঙ্গমের ঠিক কাছে, তুলনামূলকভাবে কম উচ্চতায় উমা-মহেশ্বরের একটি বিশাল, বিশাল মূর্তি খোদাই করা হয়েছে, যা মহাভারত খ্যাতির হিড়িম্বা নামে পরিচিত।

পাহাড়ের আশেপাশে বেশ কিছু আলগা পাথরের ভাস্কর্যও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাওয়া গেছে। কিছু ভাস্কর্য পাহাড়ের চূড়ার একটি শেডের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে বিষ্ণু, হরা গৌরী, হরিহর, নরসিংহ, গণেশ, হনুমান, কল্যাণসুন্দরমূর্তি এবং হিন্দু ট্রিনিটির ছবি, সেগুলি শৈলীগতভাবে ১১-১২ শতকের হতে পারে। দুটি চতুর্মুখলিঙ্গ এবং একটি এক-মুখলিঙ্গ (যথাক্রমে চারটি এবং একটি মুখবিশিষ্ট লিঙ্গ) প্রাথমিক মধ্যযুগীয় শিল্পেরও সেখানে পাওয়া গেছে।

লিঙ্গে চিত্রিত শিবের চারটি মুখের মধ্যে দুটি ভালোভাবে সংরক্ষিত আছে, যা শিবের মননশীল রূপকে চিত্রিত করার ক্ষেত্রে ভাস্করদের দক্ষতার সাক্ষ্য দেয়। এই ঢিলেঢালা ভাস্কর্যগুলির শৈলী, মূর্তি এবং কারুকার্যের গুণমান পাহাড়ের ঢালে খোদাই করা চিত্রগুলির চেয়ে উচ্চতর।

ঊনকোটির একমাত্র শিলালিপিটি অন্যান্য চতুর্মুখলিঙ্গের চিত্রে রয়েছে, যেটিতে ১১-১২ শতকের বাংলা চরিত্রের কয়েকটি রেকর্ড রয়েছে, যেখানে একজন শ্রীজয়দেবের উল্লেখ রয়েছে, সম্ভবত একজন তীর্থযাত্রী। এ অঞ্চলের ভাস্কর্যেও বৌদ্ধধর্মের প্রভাব দেখা যায়। এখানে বোধিসত্ত্ব, বুদ্ধ এবং বৌদ্ধ মোটিফের বিভিন্ন চিত্র রয়েছে।

এই এলাকায় পাওয়া অনেক চিত্র থেকে শাক্ত, তান্ত্রিক, বজ্রযানী এবং নাথযোগীদের মতো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপস্থিতিরও ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রতি বছর হিন্দু ক্যালেন্ডারের চৈত্র মাসে (এপ্রিল-মে) ঊনকোটিতে ‘অশোকাষ্টমী মেলা’ নামে পরিচিত একটি বড় মেলা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে হাজার হাজার তীর্থযাত্রী আসেন। এই ‘অশোকাষ্টমী মেলা’ অসামান্য সর্বজনীন মূল্যের ন্যায্যতাকে প্রকাশ করে।

ঊনকোটির বিশাল বাস-রিলিফগুলি উঁচু পাহাড় এবং সবুজ বনের ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। ঊনকোটির মোট সংরক্ষিত এলাকা ১৫০ (একশত পঞ্চাশ) একর। স্থানটি হিন্দু দেবতা যেমন শিব, পার্বতী, গঙ্গা, গণেশ এবং উমা-মহেশ্বর (স্থানীয়ভাবে হিড়িম্বা নামে পরিচিত) ইত্যাদির বিশাল রক-কাটা ছবিগুলির উপস্থিতির জন্য বিখ্যাত। শিবের মাথা, কাছিম, লিঙ্গ ইত্যাদিও পাথরের উপর খোদাই করা আছে। বিষ্ণু, হর-গৌরী, হরি-হরা, নরসিংহ, গণেশ এবং হনুমান ইত্যাদির বেশ কিছু ঢিলেঢালা পাথরের ভাস্কর্যও এই স্থানের আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাওয়া যায়।

ঊনকোটি খোদাইয়ের একটি অনন্য দিক হলো দেবতার শরীরের বিভিন্ন অংশের শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্যগুলির নকশা। সমগ্রের সাথে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করার কোনো প্রচেষ্টা ছাড়াই এগুলোকে শুধুমাত্র তাদের বিস্তৃত দিক থেকে বিবেচনা করা হয়। অলঙ্কারের নকশা স্থানীয় উপজাতিদের প্রভাব দেখায়; তাই বেস রিলিফগুলি স্থানীয় কারুশিল্পের ঐতিহ্যে হিন্দু দেবতাদের প্রতিকৃতি দেখায়।

সবুজ, স্রোতধারা এবং নদীপথের মধ্যে বিস্ময়কর শিলা খোদাই শুধু স্মৃতিস্তম্ভটিকে আরও সুন্দর এবং অনন্য করে তোলে তা নয়, ল্যান্ডস্কেপটি বিভিন্ন ব্রাহ্মণ্য দেবতাকে খোদাই করার জন্য এবং স্থানটিকে একটি পবিত্র সাংস্কৃতিক স্থানে রূপান্তরিত করার জন্য প্রাকৃতিক ভূতত্ত্বের ব্যবহারে মানুষের চাতুর্যকেও প্রতিফলিত করে। ল্যান্ডস্কেপ যা আজও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার উৎস হিসেবে কাজ করে চলেছে।

অনেক গবেষক অনুমান করেন, এই বিশালকায় রক আর্ট গ্যালারি কোনো না কোনো রাজা বা সম্রাটের আমলে তৈরি। সাধারণ কোনো ধনী বা জমিদারের পক্ষে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেখানেই ওঠে প্রশ্ন, রাজা, মহারাজা বা সম্রাটেরা নিজেদের শাসনকালের সেরা অবদানগুলি ধরে রাখতেন তাঁদের লেখানো ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু ঊনকোটির নাম নেই কেন!

ইতিহাসবিদদের মতে ঊনকোটির এই অভিনব ভাস্কর্যগুলি তৈরি হয়েছিল অষ্টম বা নবম শতাব্দীতে। সেই সময় এই এলাকা সহ সমগ্র ত্রিপুরা শাসন করতেন হিন্দু ফা- রাজারা। ষষ্ঠ শতাব্দীতে রাজা প্রতীত এই রাজবংশের পত্তন করেছিলেন। ফা রাজারা শৈব ছিলেন। তাঁরা যদি ঊনকোটির অনবদ্য রক আর্ট ভারতবর্ষকে উপহার দিয়ে থাকেন, সেকথা কেন লেখা নেই রাজা ধর্ম মাণিক্যের শাসনকালে লেখা, ত্রিপুরা সম্পর্কিত আকরগ্রন্থ রাজমালায়!

অনেক গবেষক প্রশ্ন তুলেছেন ভারতের প্রায় সমস্ত রক আর্টের সময়কাল ও পৃষ্ঠপোষক রাজা বা রাজবংশের হদিশ পাওয়া গেলেও ব্যতিক্রম ঊনকোটি। তাই ইতিহাসে উৎসাহী মানুষদের মনে জাগে হাজার প্রশ্ন। ভাস্কর্যের জন্য কেন নির্বাচন করা হয়েছিল জনবিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এই এলাকা? শৈবতীর্থে শিবমন্দির না বানিয়ে আস্ত পাহাড়টিকেই কেন শিবমন্দিরে রূপান্তরিত করে ফেলা হয়েছিল?

ভারতকে এহেন অবিশ্বাস্য শিল্পকর্ম উপহার দিয়ে গেলেও, কালু কুমোরের নাম লেখা নেই পুরাণ বা ইতিহাসে। কালু কুমোরের কোনো হদিশ পাননি পুরাতাত্ত্বিক, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও ইতিহাসবিদেরা। তাই তিনি বাস্তবের কোনো মানুষ না কাল্পনিক চরিত্র তাও জানা যায় না। তবে এটা বাস্তব, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সমাপ্ত করা একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কয়েক শত প্রশিক্ষিত ও পেশাদার ভাস্কর বানিয়েছিলেন এই অত্যাশ্চর্য রক আর্ট গ্যালারি। কিন্তু তাঁরা কারা! সে উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।

ঊনকোটির রহস্য এক সময় পৌঁছে গিয়েছিল ত্রিপুরার উত্তর থেকে দক্ষিণে। গভীর থেকে গভীরতর হয়ে সে রহস্য প্রবাহিত হয়েছে গোমতী নদীর স্রোতধারায়। দক্ষিণ ত্রিপুরায় আছে ৮৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দেবতামুড়া পর্বতমালা। তারই একটি অংশ ছবিমুড়া। গোমতী নদীর তীর থেকে খাড়া উঠে যাওয়া পাথুরে কালাঝারি পাহাড়ে কারা যেন অসীম মমতায় কুঁদে রেখে গিয়েছে দেবী দুর্গা, গণেশ ও কার্তিক সহ আরও অনেক দেবদেবীর মূর্তি। কারা বানিয়েছিলেন এই দৃষ্টিনন্দন মূর্তিগুলি, কারা করেছিলেন পৃষ্ঠপোষকতা, সে বিষয়েও বিস্ময়করভাবে নিশ্চুপ ইতিহাস। তবে ইতিহাসবিদেরা বলেন দেবতামুড়ার ভাস্কর্যগুলি ঊনকোটির থেকে পাঁচ সাতশো বছর পরে তৈরি।

দেবতামুড়া পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা মা দুর্গা কালের ফারাক থাকলেও, ইতিহাস কিছু লিখে না রাখায় সন্দেহ হয়, ঊনকোটি ও দেবতামুড়ার মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই তো! ইচ্ছাকৃতভাবে সব তথ্য মুছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়নি তো! অনেকে ঊনকোটির ভাস্কর্যগুলির মধ্যে ট্রাইবাল আর্টের স্পর্শ খুঁজে পান। তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগে, ঘন অরণ্য ও পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া কোনো অনাবিষ্কৃত সভ্যতা আমাদের ঊনকোটি উপহার দিয়ে যায়নি তো!

রঘুনন্দন পাহাড়ই হয়ে উঠেছে শিবমন্দির। ভারতের প্রায় সমস্ত রক আর্টের সময়কাল ও পৃষ্ঠপোষক রাজা বা রাজবংশের হদিশ পাওয়া গেলেও ব্যতিক্রম ঊনকোটি। তাই ইতিহাসে উৎসাহী মানুষদের মনে জাগে হাজার প্রশ্ন। ভাস্কর্যের জন্য কেন নির্বাচন করা হয়েছিল জনবিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এই এলাকা? শৈবতীর্থে শিবমন্দির না বানিয়ে আস্ত পাহাড়টিকেই কেন শিবমন্দিরে রূপান্তরিত করে ফেলা হয়েছিল?

আজও শ্যাওলার সোঁদা গন্ধভরা প্রাচীন অরণ্যের বুকে অবহেলায় পড়ে আছে রঘুনন্দন পাহাড়ের ঊনকোটি। ঊনকোটি সম্পর্কিত কোনো প্রশ্নেরই অকাট্য ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর নেই। পুরাণের অহল্যার মতো অপেক্ষা করছে কোনো এক মহামানবের, যিনি বিশ্বকে জানাবেন। কে বা কারা, রক আর্টের ইতিহাসের অন্যতম সেরা নিদর্শনটি উপহার দিয়ে নীরবে বিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে, যাদের মনে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি ইতিহাস।

লেখক, কবি ও কথা শিল্পী


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category