• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন

তাজু ভাই: জিলাপির সরকারি রেট আর মাটির দ্রোহ

মোকছেদুর রহমান / ১১৬ Time View
Update : শুক্রবার, ২৯ মে, ২০২৬

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর সেই ব্রহ্মপুত্র পাড়ের যুবক তাইজুল ইসলাম। নেট দুনিয়া যাকে চেনে ‘তাজু ভাই’ নামে। তাঁর নামের আগে কোনো গালভরা ডিগ্রি নেই। পেছনে কোনো প্রভাবশালী মিডিয়া নেই। আছে কেবল সোজাসাপ্টা কথা বলার সাহস।
তাজু ভাই কোনো সংবাদকর্মী নন। তিনি রাজমিস্ত্রির সহকারী। অথচ তাঁর হাতের মোবাইল ফোনটি এখন শক্তিশালী হাতিয়ার। তিনি শব্দ দিয়ে ফুলঝুরি ফোটান না। তিনি সরাসরি চোখে আঙুল দিয়ে অনিয়ম দেখান। নেট দুনিয়ায় তাঁর নাম এখন ‘তাজু ভাই’।
তিনি প্রথা ভাঙছেন। তিনি ব্যাকরণ মানছেন না। কেবল সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা বলছেন। এই ভাষা বুঝতে কোনো অভিধান লাগে না। লাগে কেবল সাহস। বাজারে জিলাপির দাম হোক বা নদীর পাড়ের ভাঙন, তাজু ভাই সবখানেই সমান সপ্রতিভ।
লোকেরা তাঁকে বিশ্বাস করছে। কেন? কারণ তিনি ‘ভদ্দরলোক’ নন। তিনি তাদেরই মতো একজন। তিনি সগর্বে বলেন, “আমি শিক্ষিত না।” এই অশিক্ষিত হওয়ার দাবিটাই তাঁকে গণমানুষের কাছে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। বড় বড় বুলি আর কঠিন শব্দের ভিড়ে তাঁর মেঠো গলার চিৎকার এখন আমাদের সমাজের নতুন এক প্রতিধ্বনি।
তাজু ভাইয়ের প্রতিবাদ জিলাপির দোকান থেকে শুরু। তিনি যখন মিষ্টির দোকানের প্যাঁচ ধরেন, তখন আসলে ধরা পড়ে আমাদের ব্যবস্থার গলদ। আমরা যারা ভদ্রলোক, আমরা প্যাঁচালো কথাবার্তায় অভ্যস্ত। আমরা নিয়ম জানি, কিন্তু প্রয়োগ করি না। তাজু ভাই নিয়ম জানেন না, কিন্তু সত্যটা ঠিকই ধরেন। তাঁর কথায় কোনো জিলাপির প্যাঁচ নেই। তাঁর কথা একদম সোজা।
অনেকে বলেন তিনি হিরো হতে চান। অনেকে বলেন ভিউ পাওয়ার নেশা। কিন্তু নদীর ভাঙনে যার ভিটে গেছে, সে কি ভিউ বোঝে? জিলাপির দাম যার বাজেটে কুলায় না, সে কি হিরো হওয়ার নেশায় দৌড়ায়? তাজু ভাই আসলে সেই অভাবী মানুষের প্রতিনিধি। তাঁর ভিডিওগুলো কোনো বিনোদন নয়। ওগুলো আমাদের অবহেলার দলিল।
সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে হাসি-তামাশা কম হয় না। ট্রল করা হয় তাঁর কথা বলার ভঙ্গি নিয়ে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই শিক্ষিত সমাজই আবার তাঁর ভিডিও শেয়ার দেয়। তারা নিজেদের কথাগুলো তাজু ভাইয়ের মুখে শুনতে চায়। কারণ তারা যা বলতে ভয় পায়, তাজু ভাই তা অনায়াসেই বলে দেন। এই যে এক অশিক্ষিত মানুষের কাছে শিক্ষিত সমাজের আত্মসমর্পণ, এটাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় সত্য।
তাজু ভাই কোনো প্রতিষ্ঠান নন। তিনি এক জনবিস্ফোরণ। তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন যে, প্রতিবাদ করতে দালান লাগে না। রাজমিস্ত্রির সেই কর্নি হাতে নেওয়া মানুষটিও চাইলে পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিতে পারেন। জিলাপির রস মিষ্টি হতে পারে, কিন্তু তাজু ভাইয়ের তোলা সত্যগুলো অনেক সময় তেতো। আর এই তেতো সত্যগুলোই এখন আমাদের বড্ড প্রয়োজন।

তাজু ভাইয়ের হাতে কোনো দামি সরঞ্জাম নেই। তাঁর আছে স্রেফ একটি সস্তা স্মার্টফোন। কিন্তু সেই ফোনের লেন্স দিয়েই তিনি শোষণের গর্তগুলো খুঁজে বের করেন। তিনি যখন কোনো বাজারের অনিয়ম নিয়ে কথা বলেন, তখন তাঁর পাশে কেউ থাকে না। অথচ সেই ভিডিও যখন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে, তখন হাজারো মানুষ তাঁর সাহসে নিজের ছায়া খুঁজে পায়।
আমাদের সমাজে আমরা অনেকেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাই। কিন্তু পারি না। কেউ সামাজিক মর্যাদার ভয়ে পিছিয়ে যাই। কেউ আবার আইনি ঝামেলার ভয়ে চুপ থাকি। তাজু ভাই ঠিক এখানেই আলাদা। তিনি কোনো কিছু হারানোর ভয় করেন না। তাঁর হারাবার কিছু নেই বলেই তিনি এতোটা স্বচ্ছ।
তিনি ডিজিটাল যুগের এক অন্যরকম নায়ক। যেখানে সবাই ফিল্টার দেওয়া সুন্দর জীবন দেখাতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি সমাজের কুৎসিত অভাবগুলো তুলে ধরেন। তাঁর ‘জিলাপির রেট’ নিয়ে করা ভিডিওটি কেবল খাবারের দাম নিয়ে ছিল না। ওটা ছিল সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এক নীরব চিৎকার। এই চিৎকার এখন গ্রামের মেঠো পথ ছাড়িয়ে শহরের ড্রয়িং রুমেও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

জনপ্রিয়তা এখন তাঁর দরজায়। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই তাজুর জন্য বড় পরীক্ষা। একদল মানুষ তাঁকে মাথায় তুলে নাচছে। অন্যদল সুযোগ খুঁজছে তাঁকে বিতর্কিত করার। তাঁর নামে ডজন ডজন ভুয়া পেজ খোলা হয়েছে। তাঁর সরলতাকে পুঁজি করে ফায়দা লুটছে একদল ‘ভিউ’ শিকারি। এটিই ডিজিটাল যুগের নির্মম রসিকতা।
তাজু ভাই কি পারবেন এই স্রোতে নিজেকে ধরে রাখতে? অনেক ভাইরাল নায়ক সময়ের স্রোতে হারিয়ে যান। কেউ লোভে পড়েন। কেউ আবার ভয়ে পিছু হটেন। কিন্তু তাজু ভাই যদি তাঁর সেই ‘মাটির দ্রোহ’ বজায় রাখতে পারেন, তবেই তিনি হবেন আসল কিংবদন্তি। তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন তাঁর নিজের সততা রক্ষা করা।
তিনি এখন কেবল কুড়িগ্রামের সেই রাজমিস্ত্রির সহকারী নন। তিনি এখন একটি স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন, যেখানে সাধারণ মানুষও অন্যায়ের সামনে বুক ফুলিয়ে দাঁড়াতে পারে। তাজু ভাই সফল হলে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সাহসগুলো প্রাণ ফিরে পাবে। আর তিনি ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের আস্থার দেয়ালটা আরও একবার ভেঙে পড়বে।
তাজু ভাই আসলে আমাদের জন্য এক সতর্কঘণ্টা। তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন, তথ্য আর সত্য কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণির সম্পদ নয়। আমরা যখন এসি রুমে বসে সেমিনারে দেশের উন্নতি খুঁজি, তখন তাজু ভাই ধুলোমাখা পথে দাঁড়িয়ে প্রকৃত সংকট ধরিয়ে দেন। তাঁর প্রতিটি ভিডিও আমাদের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের বিবেককে এক একটা ধাক্কা দেয়।
এই সতর্কঘণ্টা আমাদের শেখায় যে, সত্য বলার জন্য সাংবাদিকতার ডিগ্রি লাগে না। লাগে কেবল মাটির সাথে যোগাযোগ। তাজু ভাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক হিরো নন। তিনি আমাদের সিস্টেমের ব্যর্থতার এক জীবন্ত ফসল। আমরা যদি তাঁর কণ্ঠকে কেবল ‘ভাইরাল বিনোদন’ হিসেবে দেখি, তবে সেটা হবে আমাদেরই পরাজয়।
তাজু ভাই এক নতুন নাগরিক সাংবাদিকতার জন্ম দিয়েছেন। যেখানে ভয় নেই। আছে সোজাসাপ্টা প্রশ্ন। এই সতর্কঘণ্টা যদি আমাদের ঘুম ভাঙাতে পারে, তবেই সমাজটা বদলাবে। নয়তো একদিন জিলাপির রসের প্যাঁচে হারিয়ে যাবে আমাদের সবার মেরুদণ্ড। তাজু ভাই আজ একা নন। তিনি আমাদের প্রত্যেকের ভেতরে থাকা সেই ঘুমন্ত প্রতিবাদের এক অবিনাশী প্রতীক।

তাজু ভাই যখন বাজারে ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান, সাধারণ মানুষের চোখে তখন এক অদ্ভুত ভরসা দেখা যায়। তারা ভিড় করে। তারা তাঁর সাহসে নিজেদের কণ্ঠ মেলায়। বহু বছর ধরে যারা বাজারের সিন্ডিকেট বা ওজনে কম দেওয়ার যন্ত্রটা দেখেও মুখ খোলেনি, তাজু ভাই তাদের হয়ে কথা বলেন। মানুষ এখন তাঁকে আর বাইরের কেউ ভাবে না। তারা ভাবে, তাজু ভাই আসলে তাদেরই একজন। এই যে মানুষের আস্থার পরিবর্তন, এটাই তাঁর বড় সার্থকতা।

তাজু ভাইয়ের এই উত্থান আসলে বড় এক বার্তা। মানুষ এখন টিভির চকচকে স্টুডিওর চেয়ে মাটির ঘ্রাণমাখা মোবাইল ভিডিও বেশি বিশ্বাস করছে। তথাকথিত মূলধারার গণমাধ্যম যখন অনেক সত্য এড়িয়ে যায়, তখন তাজু ভাইয়ের সস্তা মোবাইল ফোনটি হয়ে ওঠে সবল আদালত। হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনটি যে প্রতিবাদের কতটা ধারালো অস্ত্র হতে পারে, তিনি তা প্রমাণ করেছেন। তাঁর এই নাগরিক সাংবাদিকতা আমাদের দেশের গণমাধ্যমের এক নতুন মোড়।

তাজু ভাইয়ের দিন কাটে রাজমিস্ত্রির সহকারী হিসেবে। হাড়ভাঙা খাটুনি আর ধুলোবালির সাথে তাঁর নিত্যবাস। অথচ দিন শেষে সেই ক্লান্ত শরীর নিয়েই তিনি বেরিয়ে পড়েন মানুষের দুর্দশার খবর নিতে। তাঁর এই পরিশ্রম কোনো সস্তা বিনোদনের জন্য নয়। এটি বেঁচে থাকার এক করুণ আর বলিষ্ঠ জেদ। নিজের পেটে খিদে নিয়ে অন্য মানুষের অধিকারের কথা বলা এই নিঃস্বার্থ লড়াইটাই তাঁকে সাধারণ ভাইরাল হওয়া মানুষের ভিড়ে অনন্য করে তুলেছে।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category