পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাদের সাথে আমাদের কোনোদিন দেখা হয় না, কথা হয় না, নেই কোনো রক্তের টান কিংবা দীর্ঘদিনের পরিচয়। অথচ তাদের জীবনের গল্প শুনলে মনের অজান্তেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে, হৃদয়ের গভীর থেকে জেগে ওঠে এক তীব্র কৌতুহল। তারা ইতিহাসের পাতায় কোনো রাজকীয় তকমা নিয়ে আসেন না, কিন্তু তাদের কর্ম তাদের এমন এক উচ্চতায় বসিয়ে দেয়, যেখানে পৃথিবীর বড় বড় বীরত্বও ম্লান হয়ে যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত এবং রহস্যময় অথচ মানবিক চরিত্রের নাম হচ্ছে ফাতেমা বেগম।
আমি তাকে কোনোদিন দেখিনি, তার সাথে আমার কখনো একটি বাক্য বিনিময় হয়নি। তিনি আমার আত্মীয় নন, এমনকি আমার পূর্বপুরুষের সাথেও তার কোনো যোগসূত্র নেই। তবুও কেন এই নারীর জীবনকাহিনী আমাকে এতটা আপ্লুত করে? কেন পৃথিবীর হাজার হাজার মাইল দূরের মানুষও তার কথা শুনে থমকে দাঁড়ায়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে তার সেই অকল্পনীয় সিদ্ধান্তে, যা আধুনিক সভ্যতায় কল্পনা করাও কঠিন।
আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে মানুষ সামান্য স্বার্থের জন্য আপনজনকে ত্যাগ করে, যেখানে স্বাধীনতার এক চিলতে বাতাসের জন্য মানুষ লড়াই করে। কিন্তু ফাতেমা ছিলেন সম্পূর্ণ উল্টো স্রোতের এক যাত্রী। তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের প্রতি মানুষের আনুগত্য এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের সঙ্গী হিসেবে ফাতেমা যা করেছেন, তা কোনো সাধারণ ভৃত্য বা সহচরীর পক্ষে সম্ভব নয়।
বেগম খালেদা জিয়ার বার্ধক্য এবং অসুস্থতার কঠিন সময়ে তার পাশে থাকার জন্য ফাতেমা যা বিসর্জন দিয়েছেন, তা বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ও অনন্য নজির। নিজের কোনো দোষ নেই, কোনো অপরাধ নেই, নেই কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা, অথচ কেবল একজন অসুস্থ মানুষের সেবা করার তাগিদে তিনি স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছিলেন অন্ধকারের কারাজীবন। টানা দুই বছরেরও বেশি সময় (২৬ মাস) তিনি কারাপ্রকোষ্ঠের চার দেয়ালের ভেতরে কাটিয়েছে। বাইরের মুক্ত আকাশ, নিজের সন্তানদের সান্নিধ্য এবং স্বাধীনতার স্বাদ, সবকিছুকে তিনি তুচ্ছজ্ঞান করেছেন কেবল তার ‘ম্যাডাম’-এর প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কারণে।
পৃথিবীর ইতিহাসে রাজভক্তির অনেক গল্প আছে, কিন্তু একজন সাধারণ নারী হয়ে অসাধারণ এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সেবায় এভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার দৃষ্টান্ত আর একটিও নেই। ফাতেমা আজ কেবল একজন ব্যক্তিগত সেবিকা নন, তিনি হয়ে উঠেছেন মানবিকতা ও সাহসিকতার এক বিশ্বজনীন প্রতীক। তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আনুগত্য কোনো কেনাবেচার পণ্য নয়; এটি আত্মার এক পরম বন্ধন।
কেন একজন নারী নিজের সাজানো সংসার, কোলের সন্তান আর মুক্ত জীবন ফেলে কারাগারের নির্জনতাকে বেছে নিলেন? কী ছিল সেই প্রেরণা? এই কৌতুহল আজ কেবল আমার নয়, সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের। এই আর্টিকেলে আমরা উন্মোচন করার চেষ্টা করব সেই নিভৃতচারী নারীর জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা ত্যাগের সেই মহাকাব্য, যা কোনোদিন পুরনো হবে না।
এজন ফাতেমা: পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর আনুগত্যের দৃষ্টান্তগুলো সাধারণত রূপকথা বা ইতিহাসের পুরনো পাতায় খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক বাংলাদেশের রাজনীতির উত্তাল সমুদ্রে এমন এক জীবন্ত কিংবদন্তি সৃষ্টি হয়েছে, যার নাম ফাতেমা। তিনি কোনো রাজনৈতিক পদধারী ব্যক্তি নন, নন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সঙ্গী। কিন্তু ফাতেমার পরিচয় কেবল সঙ্গী বা ‘পরিচারিকা’ শব্দে সীমাবদ্ধ করা তার প্রতি অবিচার হবে। তিনি হয়ে উঠেছেন শ্রদ্ধা, ধৈর্য এবং এক অকল্পনীয় মানবিক ত্যাগের মূর্ত প্রতীক।
ফাতেমা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে আছেন দীর্ঘদিন ধরে। গুলশানের ‘ফিরোজা’র রাজকীয় দিনগুলো থেকে শুরু করে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি হারানো, সব কঠিন সময়েই ফাতেমা ছিলেন বেগম জিয়ার পাশে। তিনি কেবল তার সেবা করতেন না, বরং নেত্রীর পছন্দ-অপছন্দ, শারীরিক অবস্থা এবং মানসিক দোলাচলগুলোও বুঝতে পারতেন। বেগম জিয়া নানাবিধ বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার দৈনন্দিন কাজে একজনের সার্বক্ষণিক সাহায্যের প্রয়োজন ছিল। ফাতেমা সেই দায়িত্বটি পালন করেছেন পরম মমতা ও পেশাদারিত্বের সাথে।
২০১৮ সালের সেই কালরাত: যখন সময় থমকে গেল: ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সাল। ঢাকার বিশেষ জজ আদালত এক রায় ঘোষণা করলেন। দেশনেত্রীকে যেতে হলো কারাগারে। নাজিমুদ্দিন রোডের সেই জরাজীর্ণ, পরিত্যক্ত পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগার। যেখানকার প্রতিটি দেয়াল লোনা ধরা, বাতাস ভারি এবং পরিবেশ বসবাসের অযোগ্য।
বেগম জিয়ার বয়স তখন ৭৩ বছর। অসুস্থ শরীর নিয়ে এই নির্জন কারাগারে থাকা তার জন্য ছিল অবর্ণনীয় কষ্টের। রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে নেত্রীকে কারাগারে পাঠিয়ে নেতাকর্মীরা যখন কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন, তখন নেপথ্যে রচিত হচ্ছিল অন্য এক ইতিহাস। ফাতেমা জানতেন, কারাগারে জেল কোড অনুযায়ী কোনো আসামির সাথে বাইরের কেউ থাকতে পারেন না। কিন্তু ফাতেমা এটাও জানতেন যে, তার ‘ম্যাডাম’কে এই অবস্থায় একা ছেড়ে দেওয়া মানে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন। স্বেচ্ছায় কারাবরণের।
ত্যাগের দৃষ্টান্ত কেবলি ফাতেমা: ফাতেমা যখন স্বেচ্ছায় কারাবরণের সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার নিজেরও একটি সংসার ছিল। তার সন্তানরা তখন মা’কে ছাড়া থাকতে শিখছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, ফাতেমা কেবল নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দেননি, তিনি বিসর্জন দিয়েছিলেন নিজের সন্তানদের সান্নিধ্য। একজন মায়ের কাছে তার সন্তানের চেয়ে বড় আর কিছুই নেই। কিন্তু ফাতেমা দেখেছিলেন, একদিকে তার জন্ম দেওয়া সন্তানরা, আর অন্যদিকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী অথচ আজ একা। ফাতেমা বেছে নিয়েছিলেন বৃহত্তর কর্তব্যের পথ। দীর্ঘ দুই বছরেরও বেশি সময় তিনি তার নিজের সন্তানদের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেননি। নিজের পরিবারের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়ে তিনি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বেগম জিয়ার হাত ধরে বসে কাটিয়েছেন নির্ঘুম রাত। পৃথিবীতে এমন নজির সত্যিই বিরল, যেখানে একজন মা কেবল সেবার নেশায় এবং আনুগত্যের খাতিরে নিজের মাতৃত্বের অধিকারকে তুচ্ছ করে অন্যের জন্য জেল খাটেন।
স্বেচ্ছায় কারাবরণ: আদালতের সেই ঐতিহাসিক অনুমতি: ফাতেমার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। তিনি কোনো রাজনৈতিক অপরাধে দণ্ডিত ছিলেন না। তবুও তিনি আদালতের কাছে করুণ আকুতি জানালেন, তাকেও যেন কারাগারে বেগম জিয়ার সাথে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। এটি ছিল আইনের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। আদালত মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে ‘সেবিকা’ হিসেবে সাথে থাকার অনুমতি দেন।
এটি ছিল মূলত ফাতেমার জন্য এক স্বেচ্ছাসেবী বন্দিত্ব। তিনি জানতেন, একবার জেলের তালা তার পেছনে লেগে গেলে, তিনি আর যখন খুশি বের হতে পারবেন না। তবুও তিনি সেই অন্ধকারকেই বেছে নিয়েছিলেন। বাইরের আলো-বাতাস ত্যাগ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বেগম জিয়ার ‘একমাত্র পৃথিবী’।
কারাগারের অন্ধকার দিনগুলো: এক নীরব যুদ্ধ: নাজিমুদ্দিন রোডের সেই পরিত্যক্ত কারাগারটি ছিল ইঁদুর আর চামচিকার উপদ্রবে ভরা। সেখানে কোনো আধুনিক শৌচাগার বা আরামদায়ক বিছানা ছিল না। শীতের রাতে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা আর গরমের দিনে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে ফাতেমা বেগম জিয়ার সেবা করেছেন। তখন বেগম জিয়ার জয়েন্টে ব্যথার কারণে তিনি নিজে নিজে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারতেন না। ফাতেমা তাকে ধরে ধরে হাঁটালে তবেই তিনি কিছুটা স্বস্তি পেতেন। জেলখানায় যখন উপযুক্ত খাবারের অভাব ছিল, ফাতেমা নিজের হাতে নেত্রীর জন্য স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করার চেষ্টা করতেন। কারাবন্দী অবস্থায় মানুষের মনে যে বিষন্নতা গ্রাস করে, তা থেকে মুক্ত রাখতে ফাতেমা ছিলেন নেত্রীর একমাত্র কথা বলার সঙ্গী। তিনি তাকে খবরের কাগজ পড়ে শোনাতেন, পুরনো স্মৃতি রোমন্থন করতেন।
মহামারীর কালবেলা এবং ফাতেমার অকুতোভয় সেবা: ২০১৯ সালের শেষের দিকে যখন বেগম জিয়াকে বিএসএমএমইউ (পিজি হাসপাতাল) কেবিনে নেওয়া হয়, সেখানেও ফাতেমা ছিলেন অবিচল। এরপর যখন সারা বিশ্বে করোনা মহামারী হানা দেয়, তখন প্রতিটি মানুষ নিজের জীবনের ভয়ে অস্থির। কিন্তু ফাতেমা এক মুহূর্তের জন্যও নেত্রীর পাশ ছাড়েননি। তিনি জানতেন, নিজে আক্রান্ত হলে নেত্রীর সেবা কে করবে? নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি মহামারীর সেই আতঙ্কিত দিনগুলো হাসপাতালের বদ্ধ কেবিনে কাটিয়ে দিয়েছেন।
ফাতেমা বেগম জিয়ার সাথে টানা দুই বছরেরও বেশি সময় (২৬ মাস) কারাগারে কাটিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কোনোদিন অভিযোগ করেননি, কোনোদিন ক্লান্তি প্রকাশ করেননি। ২০২০ সালের ২৫শে মার্চ সরকার যখন নির্বাহী আদেশে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেয়, সেদিন বেগম জিয়ার সাথে হাসিমুখে বের হয়ে এসেছিলেন ফাতেমাও। সেই হাসিতে ছিল বিজয়ের আনন্দ নয়, বরং প্রিয় মানুষটিকে সুস্থভাবে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার তৃপ্তি। ফাতেমার এই ত্যাগ প্রমাণ করেছে যে, আনুগত্য কোনো কেনাবেচার পণ্য নয়, এটি অন্তরের গভীর থেকে আসা এক নিঃস্বার্থ শ্রদ্ধা।
বিশ্বের ইতিহাসে অনেক বিশ্বস্ত ভৃত্যের গল্প আছে, কিন্তু ফাতেমার মতো নিরপরাধ অবস্থায় দুই বছর জেল খাটার ঘটনা আর একটিও নেই। ফাতেমা আমাদের সমাজের সেই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়েছেন যে, ‘টাকার বিনিময়ে সেবা কেনা যায়’। ফাতেমার সেবা কোনো টাকা বা প্রতিপত্তির জন্য ছিল না; এটি ছিল সহমর্মিতার চরমতম বহিঃপ্রকাশ।
আজ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম যতবার উচ্চারিত হবে, ততবার ফাতেমার এই নীরব বিপ্লব মানুষের মনে অনুপ্রেরণা জোগাবে। তিনি কেবল একজন সাধারণ নারী নন, তিনি হলেন মানবিকতার এক ‘অঘোষিত নোবেল বিজয়ী’।
ফাতেমা আজ আর কেবল বেগম জিয়ার ব্যক্তিগত সহচরী নন, তিনি বাংলাদেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কাছে এক শ্রদ্ধার নাম। তার এই দুই বছরের জেলজীবন ছিল ত্যাগের এক মহাকাব্য। যে যুগে ভাই ভাইকে চেনে না, সন্তান বাবা-মাকে ত্যাগ করে, সেই যুগে ফাতেমা দেখিয়ে দিলেন, পরের জন্য জীবন বিলিয়ে দেওয়ার নামই হলো প্রকৃত মনুষ্যত্ব।
বাংলাদেশের মানুষ ফাতেমাকে মনে রাখবে এক অনন্য ‘সেবা জননী’ হিসেবে। ফাতেমার এই ত্যাগের কাহিনী আগামী প্রজন্মের কাছে সাহসিকতা ও আনুগত্যের এক অবিস্মরণীয় পাঠ হয়ে থাকবে।
ফাতেমার সংগ্রামী শৈশব ও অকাল বৈধব্য: ফাতেমার জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। তার বাবার নাম রফিজল ইসলাম এবং মা মালেকা বেগম। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে ফাতেমা সবার বড় ছিলেন। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া ফাতেমার বিয়ে হয়েছিল একই এলাকার কৃষক হারুন লাহাড়ির সাথে। মেঘনা নদীর চরের সংগ্রামী জীবনে তারা সুখের স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালে এক ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে আসে তার জীবনে। বিয়ের অল্প কয়েক বছরের মাথায় তার স্বামী হারুন লাহাড়ি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। তখন ফাতেমার কোলের ছেলের বয়স ছিল মাত্র দুই বছর।
স্বামীর মৃত্যুর পর দুই শিশু সন্তান-মেয়ে জাকিয়া ইসলাম রিয়া এবং ছেলে মো. রিফাতকে নিয়ে ফাতেমা অকুল পাথারে পড়েন। বাবার সামান্য আয়ে সংসার চলছিল না। তখন নিজের কোলের সন্তানদের গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার কাছে রেখে কাজের সন্ধানে বুক ফেটে আসা কান্না চেপে তিনি ঢাকায় পাড়ি জমান। ২০০৯ সালে এক পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি বেগম জিয়ার বাসভবন ‘ফিরোজা’য় কাজ শুরু করেন।
ফাতেমা যখন বেগম জিয়ার সেবায় নিজেকে সঁপে দেন, তখন তার নিজের সন্তানরা বড় হচ্ছিল মাকে ছাড়া। দীর্ঘ ১৬ বছরের এই সেব জীবনে ফাতেমা তার সন্তানদের সাথে প্রায় ৩০টি ঈদ করতে পারেননি। যখনই ঈদের ছুটি আসত, অসুস্থ নেত্রীকে একা রেখে যাওয়ার কথা তিনি চিন্তাও করতে পারতেন না। নিজের সন্তানদের শৈশব-কৈশোর উৎসর্গ করেছেন তিনি অন্য একজনের জীবনের জন্য।
২০২৫ সালের শেষ দিকে (৩০ ডিসেম্বর) বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ অসুস্থতার পর যখন মৃত্যু ঘটে, তখন ফাতেমা ছিলেন সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়া মানুষদের একজন। হাসপাতালের শেষ মুহূর্ত থেকে শুরু করে জানাজা ও দাফন পর্যন্ত তিনি এক মুহূর্তের জন্যও কফিনের পাশ ছাড়েননি।
বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর জিয়া পরিবার ফাতেমাকে কেবল একজন কর্মচারী হিসেবে নয়, বরং পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে গ্রহণ করেছে। বর্তমানে ফাতেমা বেগম জিয়ার নাতনি এবং তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ফাতেমার দীর্ঘ ১৬ বছরের নিঃস্বার্থ ত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ জিয়া পরিবার তার সন্তানদের পড়াশোনা, কর্মসংস্থান এবং ফাতেমার স্থায়ী আবাসের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।