• বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৪ অপরাহ্ন

বাংলাদেশঃ নাম ও ভূখণ্ডগত বিবর্তন

Reporter Name / ২২৭ Time View
Update : শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী, ২০২৬

মোঃ ফারুক হোসেন

বর্তমান স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ পূর্ব ভারতের বাঙালি জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বঙ্গদেশের একটি অংশ বিশেষ। হাজার বছর ধরে ঐতিহাসিক, ভাষিক, ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের মাধ্যমে “বঙ্গদেশ ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর” জন্ম হয়েছে। প্রায় আশি হাজার বর্গমাইল বিস্তৃত নদীবিধৌত পলি দ্বারা গঠিত এক বিশাল সমভূমি ও কিছু পাহাড়ি অঞ্চল নিয়ে বঙ্গদেশ গড়ে উঠে। এর পূর্বে ত্রিপুরা, গারো ও লুসাই পর্বতমালা; উত্তরে শিলং মালভূমি ও নেপাল তরাই অঞ্চল; পশ্চিমে রাজমহল ও ছোট নাগপুর পর্বতরাজির উচ্চভূমি এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।
প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে প্রাচীন কাল এবং মুসলিম শাসনের প্রায় প্রথম দেড়শত বছর পর্যন্ত বঙ্গদেশে কোনো একক অখন্ডিত আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক সত্তা ছিল না। বঙ্গদেশ তখন বিভিন্ন খন্ড খন্ড রাজ্যে বা জনপদে বিভক্ত ছিল। যেমন: বঙ্গ, পুন্ড্র, রাঢ়, সুক্ষ্ম, গৌড়, সমতট, হরিকেল, বরেন্দ্র, তাম্রলিপ্তি, চন্দ্রদ্বীপ প্রভৃতি। মৌর্য,গুপ্ত, গুপ্ত-উত্তর,পাল ও সেন বংশের রাজাগণ পর্যায়ক্রমে এই সকল জনপদ শাসন করেছেন কখনো আলাদাভাবে, আবার কখনো কয়েকটি জনপদকে একত্রিত করে। প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে গুপ্ত শাসন (পঞ্চম শতাব্দী) পর্যন্ত বঙ্গদেশের প্রাচীন জনপদগুলো মোটামুটিভাবে স্থায়ী ছিল। গুপ্ত-উত্তর শাসনামলে (ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে) প্রাচীন জনপদগুলো বঙ্গ ও গৌড় এই দুইটি জনপদে বিভক্ত হয়ে পড়ে, অন্যান্য জনপদগুলো এই দুইটি জনপদের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। এইভাবে গুপ্ত-উত্তর সময় থেকে বঙ্গদেশ বঙ্গ ও গৌড় এই দুইটি নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রায় ৫২৫ খ্রিষ্টাব্দ হতে ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য, সমাচারদেব এই তিনজন রাজার নেতৃত্বে স্বাধীন বঙ্গরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিছুকাল পরেই এই বঙ্গরাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে রাজা শশাঙ্ক এই বঙ্গদেশে স্বাধীন, শক্তিশালী ও সমৃদ্ধশালী গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর পর পাল ও সেন আমলে (অষ্টম শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দি পর্যন্ত) বঙ্গদেশ গৌড় নামেই পরিচিতি লাভ করে, যদিও শশাঙ্ক,পাল ও সেন রাজারা গৌড় নামে সমগ্র বঙ্গদেশকে সুসংহত করতে ব্যর্থ হয়।

১২০৪ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর সালতানাতের তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি সেন বংশের রাজা লক্ষণ সেনকে বিতাড়িত করে গৌড়ে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম বিজয়ের পর গৌড়ের নাম হয় লখনৌতি। পরবর্তীতে লখনৌতির মধ্যে সাতগাঁও ও সোনারগাঁও নামে দুইটি প্রশাসনিক অঞ্চলের জন্ম হয়। লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও নামে তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চল ও রাজনৈতিক সত্তা গড়ে উঠলেও মুসলিম শাসনের প্রায় প্রথম দেড়শত বছর (১২০৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) বঙ্গদেশে প্রাচীন জনগুলোর মোটামুটি প্রচলন ছিল। ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতির স্বাধীন সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ্ সর্বপ্রথম এই তিনটি প্রশাসনিক অঞ্চলকে একত্রিত করে একক শাসনাধীনে নিয়ে এসে এর নামকরণ করেন “মূলক-ই-বাঙ্গালাহ্”এবং তিনি নিজেকে “বাঙ্গালাহ্”-এর সুলতান হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এইভাবে “বাঙ্গালাহ্” নামটির প্রচলন শুরু হয় এবং “বাঙ্গালাহ্” নামে বৃহত্তর জনপদ গড়ে উঠে।
১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে বাঙ্গালাহ্ জনপদ মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। মুঘল সাম্রাজ্য কয়েকটি সুবা বা প্রদেশে বিভক্ত হলে বাঙ্গালাহ্ জনপদ একটি সুবায় পরিণত হয়। তখন এর নাম হয় “সুবা বাঙ্গালাহ্” এবং তখন থেকেই বাঙ্গালাহ্ নামটি দেশবাচক নাম হিসাবে ব্যবহৃত হয়। পর্তুগীজরা এদেশে এসে ফরাসি বাঙ্গালাহ্ নামটিকে তাদের ভাষাগত উচ্চারণে “বেঙ্গালা” (ইবহমধষধ) নামে প্রকাশ করেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হলে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজরা ইংরেজি ভাষায় সুবা বাঙ্গালাহ্-এর নাম লেখেন “বেঙ্গল” (ইবহমধষ) এবং তারা বেঙ্গলের সাথে বিহার, উড়িষ্যা ও ছোট নাগপুর যুক্ত করে “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি” গঠন করেন। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকারের আটটি প্রদেশ ছিল, তার মধ্যে “বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি” ছিল সবচেয়ে বড় প্রদেশ। বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির বেঙ্গল অঞ্চলটির পূর্বাংশ পূর্ববঙ্গ/পূর্ব বাংলা (ঊধংঃ ইবহমধষ) এবং পশ্চিমাংশ পশ্চিমবঙ্গ/পশ্চিম বাংলা (ডবংঃ ইবহমধষ) নামে পরিচিতি পায়। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বঙ্গভঙ্গের ঘটনা ব্যতীত ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত বেঙ্গল অখন্ডিত বা অবিভক্ত ছিল।

বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির সময়কালে (১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) এই অঞ্চলে (পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গ একত্রিতভাবে) শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উৎপত্তি হয়; নবজাগরণের সৃষ্টি হয়; স্বদেশিকতা, দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদের সম্মিলন ঘটতে থাকে; বিভিন্ন আলোচনা ও লেখনীর মধ্যে ইংরেজি “বেঙ্গল” শব্দটির মাতৃভাষিক ও দেশীয় প্রতিশব্দ ও পরিভাষা হিসেবে বাংলা, বঙ্গ, বঙ্গদেশ, বাংলাদেশ নামগুলোর ব্যবহার চলে আসে। সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় “বঙ্গদেশ” নামটি উল্লেখ করেন (বঙ্গদেশের কৃষক, বঙ্গদর্শন পত্রিকা-১৮৭২)। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্যারীচাঁদ মিত্র ও রঙ্গলাল বন্দোপাধ্যায়ের রচনাতেও বঙ্গদেশ নামটি এসেছে। বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদকেন্দ্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে (১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) বাংলাদেশ নামটি ব্যবহার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১টি গানে: আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি-১৯০৫), জীবনানন্দ দাশ (১টি চিঠিতে: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে লেখা-১৯২৯), কাজী নজরুল ইসলাম (১টি গানে: নম: নম: নমো বাংলাদেশ মম-১৯৩২), সুকান্ত ভট্টাচার্য (১টি কবিতায়: দূর্মর) বাংলাদেশ নামটি ব্যবহার করেছেন। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের রচনাতেও এবং সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রেও উচ্চারিত হয়েছে বাংলাদেশ নামটি।

প্রাচীনকালে বঙ্গদেশ বিভিন্ন জনপদে বিভক্ত ছিল; বিভিন্ন বংশ ও ধর্মের রাজাগণ এগুলো শাসন করেছেন যা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। মৌর্য থেকে সেন বংশ পর্যন্ত রাজাগণ হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিলেন। এর ফলে মুসলিম শাসনের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে কখনো হিন্দু ধর্মের আবার কখনো বৌদ্ধ ধর্মের প্রাধান্য ছিল। পাল শাসনামলে সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীতে বাণিজ্য ও ইসলাম প্রচারের জন্য পারস্য ও তুর্কিস্তান থেকে সেমেটিক গোত্রের আরব মুসলমানরা (শক জাতি) চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর দিয়ে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চলে তথা বঙ্গদেশের পূর্ববঙ্গে আগমন করেন। এই শক জাতির মাধ্যমে এই অঞ্চলে (পূর্ববঙ্গে) ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটতে থাকে। এই সময় বিভিন্ন সুফি-সাধক, পীর ও ওলি ব্যক্তিদের মাধ্যমেও এই অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম বিকশিত হতে থাকে। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে ইসলাম ধর্ম রাষ্ট্রীয়ভাবে বিকশিত হয়। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সংস্কৃতি প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। এইভাবে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিবর্তনের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পশ্চিমবঙ্গ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে পরিণত হয়।
১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলে পূর্ববঙ্গ/পূর্ব বাংলা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তা পাকিস্তান রাষ্ট্রের এবং পশ্চিমবঙ্গ/পশ্চিম বাংলা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তা ভারত রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের শুরু থেকে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত বাংলা ভাষা আন্দোলন চলমান থাকে। এই আন্দোলন পূর্ব বাংলার “বাংলাদেশ” নামকরণকে অনুপ্রাণিত করেছে। ১৯৫৬ সালের সংবিধানে পূর্ব বাংলার নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু পূর্ব বাংলার জনগোষ্ঠীর মানসপটে পূর্ব বাংলা নামটি থেকেই যায়। ষাটের দশকে পূর্ব বাংলায় একটি নতুন স্বতন্ত্র দেশের জন্য আন্দোলন শুরু হয়। তখন বাংলা শব্দটির সাথে দেশ শব্দটি যুক্ত হয়ে একটি স্বতন্ত্র ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের নাম হিসেবে “বাংলাদেশ” নামটি চলে আসে। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের স্লোগান ছিল, “তোমার দেশ আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ; বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।” ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পূর্ব বাংলার মানুষ বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের জন্য লড়াই করেছেন এবং শহীদ হয়েছেন। ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর প্রথম সংবিধানে পূর্ব বাংলার স্বাধীন দেশে “বাংলাদেশ” নামটিই সাংবিধানিক নাম “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ” হিসেবে গৃহীত হয়েছে।

সহায়ক গ্রন্থসমূহঃ
১। বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থা ও রাজনীতি ড. আবুল ফজল হক ২। বাংলাদেশের ইতিহাস (মুসলিম বিজয় থেকে সিপাহী বিদ্রোহ, ১২০০ – ১৮৫৭) আব্দুল করিম ৩। প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি- আব্দুল মমিন চৌধুরী ৪। বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)- মো: আব্দুল জব্বার। ৫। ভারতের ইতিহাস কথা (প্রাচীন যুগ হতে ১৭০৭ খ্রিষ্টাব্দ)-ড. কিরন চন্দ্র চৌধুরী ৬। বাংলাদেশ ইতিহাস পরিক্রমা কে এম রাইজউদ্দিন খান ৭। লাল নীল দীপাবলি- ড. হুমায়ুন আজাদ ৮। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস – ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ ৯। বাংলাদেশের সংবিধান, অনুচ্ছেদ- ১ (প্রজাতন্ত্র)।
লেখক, সহযোগী অধ্যাপক


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category