(অক্টবর -২০২৫, সংখ্যা-০৩)
বগুড়ার জলেশ্বরীতলা। শহরের প্রাণকেন্দ্র। এখানেই দাঁড়িয়ে আছে “আলবেলি ফার্নিচার”। তরুণ উদ্যোক্তা জুয়েলের স্বপ্ন আর শ্রমের প্রতীক। বড় আকারের ফার্নিচার কারখানা, আধুনিক ডিজাইন, গুণগত মান আর গ্রাহক সন্তুষ্টির সমন্বয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের ব্যবসার আলাদা পরিচিতি। ব্যবসায়িক সুনামের পাশাপাশি তিনি তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্যও এক অনুপ্রেরণার নাম। আলোচনা ম্যাগাজিনের সঙ্গে খোলামেলা আলাপচারিতায় উঠে এসেছে তার উদ্যোক্তা-ভ্রমণের গল্প, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
আলোচনা: আপনার উদ্যোক্তা-ভ্রমণ শুরু করার পেছনে মূল অনুপ্রেরণা কী ছিল?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: ছোটবেলা থেকেই হাতে-কলমে কাজ করার প্রতি আমার আলাদা টান ছিল। পরিবারেও ব্যবসার একটা ধারা ছিল, যা আমাকে ভেতরে ভেতরে সাহস জুগিয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা এসেছে নিজের ভেতরের স্বাধীনতার তাগিদ থেকে।
চাকরির সীমাবদ্ধতার ভেতর আটকে থাকার বদলে আমি চেয়েছি এমন কিছু গড়তে, যেটা হবে আমার নিজের চিন্তার প্রতিফলন, আমার শ্রম ও সৃজনশীলতার ফল। আমি সবসময় ভেবেছি, শুধুমাত্র নিজের জন্য নয়, বরং মানুষের চাহিদা মেটাতে, নতুন নতুন জিনিস উপহার দিতে এবং অন্যদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই হবে আমার মূল লক্ষ্য। সমাজের জন্য ইতিবাচক কিছু করার ইচ্ছাই আমাকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে।
এক কথায়, স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বপ্ন, কিছু নতুন তৈরির নেশা এবং মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর আনন্দ, এই তিন মিলেই আমার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার যাত্রা শুরু।

আলোচনা: ‘আলবেলি ফার্নিচার’ প্রতিষ্ঠার শুরুর সময়টা কেমন ছিল? কোন চ্যালেঞ্জগুলো সবচেয়ে বেশি মনে আছে?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: শুরুটা সত্যিই সহজ ছিল না, বরং বলা যায় ছিল অনেক চড়াই-উতরাইয়ের ভ্রমণ। উদ্যোক্তা হিসেবে প্রথম যে সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম তা হলো পুঁজি সংকট। ব্যবসার স্বপ্ন অনেক বড় হলেও বাস্তবতা হলো সীমিত মূলধন দিয়ে কাজ শুরু করতে হয়েছে। এর সঙ্গে ছিল দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মী পাওয়ার সমস্যা। ভালো কারিগর ছাড়া ফার্নিচার ব্যবসায় মান বজায় রাখা যায় না, এই বিষয়টা আমি শুরু থেকেই বুঝতাম। কিন্তু অভিজ্ঞ লোকজনকে বোঝানো, তাদেরকে টিমে যুক্ত করা তখনকার সময়ে বেশ কঠিন ছিল।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বাজারে টিকে থাকার লড়াই। চারপাশে অসংখ্য শো-রুম, প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ড আর প্রতিযোগিতা, এ অবস্থায় অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, ‘তুমি কি আদৌ এই ভীড়ে টিকে থাকতে পারবে?’ কিন্তু আমি আত্মবিশ্বাস হারাইনি। আমি ভেবেছিলাম, যদি সততা, মানসম্পন্ন কাজ আর গ্রাহকের আস্থাকে সামনে রাখি, তাহলে আলবেলি ফার্নিচার একদিন আলাদা জায়গা করে নেবেই।
প্রথম দিকে প্রতিটি দিন ছিল পরীক্ষার মতো। কখনো পণ্যের মান নিয়ে, কখনো ডেলিভারি নিয়ে, আবার কখনো বাজারে গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নানা দুশ্চিন্তা আসত। তবুও হাল ছাড়িনি। ধীরে ধীরে মানুষের আস্থা অর্জন করেছি, গ্রাহকেরা আমাদের কাজ চিনেছে, পণ্যের গুণমান ও সেবাকে বিশ্বাস করেছে। আজ যখন দেখি, আমাদের প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন গ্রাহক আসছে, পুরনো গ্রাহকেরা আবার ফিরছে, তখন মনে হয় সেই কঠিন সময়ের প্রতিটি পরিশ্রমই সার্থক হয়েছে।
আলোচনা: আপনার প্রতিষ্ঠানে কতজন তরুণ কাজ করছে এবং কর্মসংস্থান তৈরিতে আপনার পরিকল্পনা কী?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: বর্তমানে আমার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৫০ জন কর্মী কাজ করছেন, যার মধ্যে অধিকাংশই তরুণ। তাদের অনেকেই আগে কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবে বেকার ছিলেন। আমি সবসময় বিশ্বাস করি, তরুণ প্রজন্মই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাণশক্তি। তাদের উদ্যম, সৃজনশীলতা ও নতুন ভাবনা একটি ব্যবসাকে সামনে এগিয়ে নিতে বড় ভ‚মিকা রাখে।
আমি চেষ্টা করছি তাদের শুধু চাকরির সুযোগ নয়, বরং পেশাগত দক্ষতা গড়ে তোলার সুযোগও দিতে। এজন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখি, যাতে তারা আধুনিক ফার্নিচার ডিজাইন, কাঠের কাজ, ফিনিশিং, এবং গ্রাহকসেবা বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। আমার লক্ষ্য শুধু নিজের প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, বরং এমন একদল দক্ষ তরুণ তৈরি করা, যারা ভবিষ্যতে নিজেরাই উদ্যোক্তা হতে পারবে।
আগামী দিনে আমি উৎপাদন পরিসর আরও বড় করার পরিকল্পনা নিচ্ছি। নতুন কারখানা ও শো-রুম স্থাপন, অনলাইন বিক্রয়ব্যবস্থা স¤প্রসারণ, এবং দেশের বাইরে বাজার খোঁজার মাধ্যমে আমি কর্মসংস্থানের পরিধি কয়েকশ’ পর্যন্ত বাড়াতে চাই। আমি বিশ্বাস করি, স্থানীয় তরুণদের ক্ষমতায়নই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি, আর সেই লক্ষ্যেই আমি কাজ করে যাচ্ছি।
আলোচনা: ফার্নিচার শিল্পে আপনি কীভাবে নতুনত্ব ও মান নিশ্চিত করছেন?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: ফার্নিচার শিল্পে টিকে থাকার মূল শক্তি হচ্ছে নতুনত্ব ও মান। আমি শুরু থেকেই এই দুটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছি। আমরা নিয়মিতভাবে ডিজাইনে পরিবর্তন আনি, কারণ গ্রাহকের রুচি ও চাহিদা সময়ের সঙ্গে বদলায়। এখনকার ক্রেতারা শুধু টেকসই ফার্নিচার চান না, তারা চায় ঘরের সৌন্দর্যের সঙ্গে মানানসই আধুনিক ডিজাইনও। তাই আমরা বাজারের প্রবণতা, গ্রাহকের মতামত ও আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড বিশ্লেষণ করে নতুন নতুন মডেল তৈরি করি।
মানের দিক থেকেও কোনো আপস করি না। কাঠ, বোর্ড, রং, সব কিছুই আমরা যাচাই-বাছাই করে সংগ্রহ করি। উচ্চমানের কাঠ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর সমন্বয়ে প্রতিটি পণ্যের নিখুঁত মান বজায় রাখি। আমাদের কারখানায় উৎপাদনের প্রতিটি ধাপে মান নিয়ন্ত্রণের আলাদা টিম কাজ করে, যাতে কোনো ত্রæটি না থাকে।
আরও একটি বিষয় আমি খুব গুরুত্ব দিই, অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রির পর গ্রাহকের খোঁজ নেয় না, কিন্তু আমরা বিক্রির পরও গ্রাহকের পাশে থাকি। কোনো সমস্যা বা ত্রæটি দেখা দিলে তা দ্রæত সমাধান করি। এভাবেই আমরা শুধু পণ্য বিক্রি নয়, গ্রাহকের বিশ্বাস বিক্রি করি।
আলোচনা: একজন তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে বগুড়ার ব্যবসা পরিবেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: আমি মনে করি, বগুড়া একটি সম্ভাবনাময় ব্যবসার শহর। উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেই নয়, এখানকার মানুষ পরিশ্রমী, উদ্যমী ও ব্যবসা-বান্ধব, যা উদ্যোক্তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। ফার্নিচার শিল্পসহ অনেক ক্ষেত্রেই এখানে ভালো বাজার তৈরি হয়েছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে এখনো কিছু অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ। উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি বড় বাধা। এছাড়া দক্ষ কর্মীর অভাবও ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যা তৈরি করে। অনেক তরুণ কাজ করতে চায়, কিন্তু পেশাগত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার ঘাটতি থাকায় তারা প্রত্যাশিতভাবে অবদান রাখতে পারে না। এই জায়গাটাতে আমাদের আরও মনোযোগ দিতে হবে।
তবুও আমি বগুড়ার ব্যবসা পরিবেশকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি। এখানে উদ্যোক্তা হওয়ার মতো মানসিকতা আছে, নতুন উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ আছে। যদি সরকার, স্থানীয় প্রশাসন এবং ব্যবসায়ী সমাজ একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে বগুড়া শুধু উত্তরাঞ্চল নয়, পুরো দেশের একটি বড় শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
আমি বিশ্বাস করি, সৃজনশীল চিন্তা, পরিশ্রম আর দৃঢ় মনোবল থাকলে এখানেই ভালো কিছু করা সম্ভব। আমরা যারা তরুণ উদ্যোক্তা, আমাদের উচিত অভিযোগ নয়, সমাধানের পথ খোঁজা। আমি চাই, বগুড়াকে এমন এক শহরে পরিণত করতে, যেখান থেকে নতুন নতুন উদ্যোক্তা উঠে আসবে এবং তারা সারা দেশের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়াবে।
আলোচনা: ডিজিটাল মার্কেটিং বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আপনার প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কতটুকু?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: ডিজিটাল মার্কেটিং এখন ব্যবসার জন্য অপরিহার্য। আমাদের ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজেই যোগাযোগ করেন। অনেক অর্ডার আমরা অনলাইনের মাধ্যমেই পাই। ভবিষ্যতে আরও বড় আকারে ই-কমার্স সেক্টরে প্রবেশের পরিকল্পনা আছে।
আলোচনা: আপনার দৃষ্টিতে বাংলাদেশের তরুণদের উদ্যোক্তা হতে কী কী গুণ থাকা জরুরি?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: আমার মতে, একজন তরুণের উদ্যোক্তা হিসেবে সফল হতে সবচেয়ে জরুরি তিনটি গুণ হলো, ধৈর্য, পরিশ্রম এবং সততা। আজকের দ্রæতগতির সময়ে অনেকেই তাৎক্ষণিক সাফল্য খোঁজে, কিন্তু বাস্তবে ব্যবসায় সাফল্য আসে ধীরে ধীরে, ধারাবাহিক পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের মাধ্যমে। শুরুর দিনগুলোতে বাধা, হতাশা ও ব্যর্থতা আসবেই, এগুলোকে ভয় না পেয়ে সেখান থেকে শেখার মানসিকতা রাখতে হবে।
উদ্যোক্তা হওয়া মানে শুধু ব্যবসা শুরু করা নয়, বরং একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। তাই নিজের কাজের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে, এবং সেই কাজের জন্য নিরলস পরিশ্রম করতে হবে। সততা হচ্ছে সেই ভিত্তি, যার ওপর একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম দাঁড়িয়ে থাকে। গ্রাহক, কর্মী ও সমাজ, সবার সঙ্গে সৎ থাকা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসাকে স্থায়ী করে তোলে।
এছাড়া সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুনত্ব আনার ক্ষমতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখনকার বাজার ক্রমাগত বদলাচ্ছে, গ্রাহকের পছন্দও পরিবর্তন হচ্ছে। তাই একজন উদ্যোক্তাকে সবসময় শেখার আগ্রহী হতে হবে, প্রযুক্তি ও ট্রেন্ড বুঝতে জানতে হবে। বাজার বিশ্লেষণের দক্ষতা থাকলে উদ্যোক্তা বুঝতে পারেন কোথায় সুযোগ আছে, কোন পণ্যে বিনিয়োগ করা উচিত, আর কীভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো যায়।
সবশেষে আমি বলব, তরুণদের আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। সাফল্যের জন্য বড় মূলধন নয়, দরকার বড় মন ও দৃঢ় সংকল্প। যে তরুণ নিজের সামর্থে বিশ্বাস রাখে, পরিশ্রম করতে ভয় পায় না, এবং সৎভাবে কাজ চালিয়ে যায়, তার উদ্যোক্তা হওয়ার পথ কেউ আটকাতে পারে না।
আলোচনা: ভবিষ্যতে ‘আলবেলি ফার্নিচার’-কে আপনি কোথায় দেখতে চান?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: আমি চাই ‘আলবেলি ফার্নিচার’ শুধু বগুড়ায় নয়, সারা দেশে পরিচিত ব্র্যান্ড হোক। সামনে ঢাকাসহ বড় শহরে আমাদের শোরুম চালু করার পরিকল্পনা আছে। দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করার ইচ্ছা রয়েছে।
আলোচনা: যারা এখনো উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী হবে?
এম এ মাহমুদ জুয়েল: স্বপ্ন দেখার সাহস রাখুন, কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পরিশ্রম করতে হবে। শুরুতে ব্যর্থতা আসবেই, কিন্তু হতাশ হওয়া যাবে না। ধৈর্য ধরে এগিয়ে গেলে সাফল্য আসবেই।