• রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৭ পূর্বাহ্ন

শোকে স্তব্ধ শাজাহানপুর

প্রতীক ওমর / ৯৫ Time View
Update : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

এক বুক আশা, সীমাহীন স্বপ্ন আর পরিবারের মুখে একটুখানি হাসি ফুটানোর দৃঢ় প্রত্যয় ছিল মোহাম্মদ শাহেদ আহম্মেদের (৩৬)। চার বছর আগে চেনা জন্মভূমির মাটি ছেড়ে পরবাসে পাড়ি জমিয়েছিলেন বগুড়ার এই শাহেদ। দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যিনি এতগুলো বছর প্রিয় পরিবারটিকে আগলে রেখেছিলেন। সেই স্বপ্নবাজ মানুষটিই আজ ফিরলেন কাঠের কফিনে বন্দি হয়ে। চিরতরে নিভে যাওয়া প্রদীপ হয়ে। চলতি মাসের ৯ তারিখ তিনি ছুটি কাটিয়ে আবার কাজের উদ্দেশ্যে ফিরে গিয়েছিলেন সৌদিতে। কিন্তু কে জানত, প্রিয়জনদের হাসিমুখ দেখার সেই বিদায়ই হবে তার জীবনের অন্তিম যাত্রা! পর দিন ১০ অক্টোবর বিকেলে পরিবারের সাথে তার শেষ কথা হয়। তখন শাহেদ ট্রানজিটে রিয়াদ বিমান বন্দরে অপেক্ষা করছিলেন জেদ্দা যাওয়ার জন্য। এরপর রিয়াদের মাটিতে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বরবর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারায় শাহেদ। সেই শাহেদের নিথর দেহ অবশেষে জন্মমাটিতে পৌঁছালে কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে গোটা এলাকার আকাশ-বাতাস। পরম মমতা আর অশ্রুসজল বিদায়ে নিজ গ্রামের মাটিতে তার দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর ঠিক আড়াইটায় বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামে শাহেদের মরদেহ বহনকারী বিশেষ গাড়িটি এসে পৌঁছায়। এসময় বুকফাটা আর্তনাদে ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলী, দুই শিশু সন্তানসহ উপস্থিত স্বজনরা। ঢাকা থেকে মরদেহের সঙ্গেই গ্রামে আসেন নিহত শাহেদের স্ত্রী ও তাদের দুই অবুঝ সন্তান—১০ বছর বয়সী কাওসার এবং ৬ বছর বয়সী জিসান। বাবার কফিনের পাশে অবুঝ সন্তানদের অঝোর ধারায় কান্না আর আহাজারি দেখে সেখানে উপস্থিত সাধারণ মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র মাদলা গ্রামজুড়ে নেমে আসে বিষাদের কালো মেঘ। একনজর প্রিয় মানুষকে দেখতে আসা হাজারো গ্রামবাসীর উপস্থিতিতে সেখানে তৈরি হয় এক চরম হৃদয়বিদারক দৃশ্যের। শোকে যেন পুরো শাজাহানপুর উপজেলা স্তব্ধ হয়ে পড়ে।

শাহেদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিনি শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা গ্রামের সন্তান। তার বাবার নাম রফিকুল ইসলাম এবং মায়ের নাম ছাহেরা বেগম। পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ফেরানো ও সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার তাগিদে চার বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরবে পারিজমান শাহেদ। পরিশ্রমী ও শান্ত স্বভাবের এই যুবক প্রবাসে থেকেও সব সময় পরিবারের খেয়াল রাখতেন। প্রায় এক মাস আগে দুই মাসের পূর্ণ ছুটি নিয়ে নিজ জন্মভূমিতে এসেছিলেন তিনি। পরিবারের সান্নিধ্যে আরও কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ও আকুলতা থাকলেও কাজের তাগিদে ছুটির মেয়াদ শেষ না হতেই মাত্র এক মাসের মাথায় গত ৯ অক্টোবর (শুক্রবার) পুনরায় সৌদির উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন।

সৌদি আরবের স্থানীয় সময় ১০ অক্টোবর বিকেল পাঁচটার দিকে রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান শাহেদ। বিমানবন্দরে নেমে টার্মিনাল-৩ এলাকা থেকে স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলীর সাথে মুঠোফোনে শেষবারের মতো কথা বলেন তিনি। কুশল বিনিময়ের পর সাবধানে থাকার পরামর্শ দিয়ে ফোন রেখে দিলেও, তার কিছুক্ষণ পরই ওই টার্মিনালে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও বিস্ফোরণ ঘটায় হুতি বিদ্রোহীরা। বিকট বিস্ফোরণে চারপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে এবং ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান শাহেদসহ বেশ কয়েকজন নিরপরাধ মানুষ। পরবর্তীতে জানা যায়, এই মর্মান্তিক ও ভয়াবহ আন্তর্জাতিক দুর্ঘটনায় নিহত ১৪ জনের মধ্যে শাহেদসহ দুজন বাংলাদেশী নাগরিক রয়েছেন।

এদিকে, শনিবার বিকেলে শাহেদের সাথে কথা হওয়ার পর থেকেই তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপেও তার কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে দেশে থাকা পরিবার চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়ে যায়। বারবার চেষ্টা করেও তার সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে চরম ব্যাকুলতায় প্রহর গুনতে থাকে পুরো পরিবার। পরদিন রোববার (১১ অক্টোবর) শেষ বিকেলে সাংবাদিকদের মাধ্যমেই প্রথম শাহেদের এই নির্মম ও ভয়াবহ পরিণতির কথা জানতে পারেন স্বজনরা। এর আগে তারা বা স্থানীয় প্রশাসন কিছুই জানতে পারেনি। প্রবাসে থাকা স্বজন হারানোর খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার পরপরই শাহেদের বাড়িতে নেমে আসে শোকের নীরবতা।

ঘটনার খবর পেয়ে ওইদিনই শাজাহানপুর উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দ্রুত শাহেদের বাড়িতে ছুটে যান এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের খোঁজখবর নেন। একইসাথে সরকারি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শাহেদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আশ্বাস প্রদান করেন।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে শাহেদের স্ত্রী কোহিনুর আক্তার কাকলী অঝোর ধারায় বলতে থাকেন, “শুক্রবার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময়ও আমাদের কত কথা হলো! সে বলল কাজের চাপে আবার দ্রুত ফিরতে হচ্ছে। শনিবার বিকেলে রিয়াদে পৌঁছেই ফোন করে বলল ভালোভাবে পৌঁছে গেছে, ভালো আছে। তারপর হঠাৎ করেই ফোন বন্ধ হয়ে গেল। আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কাজ বা ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে পারছে না। কিন্তু সে যে এভাবে চিরতরে শেষ হয়ে যাবে, তা আমরা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। এখন আমার এ দুটি ছোট অবুঝ ছেলেকে নিয়ে আমি কোথায় যাব, কীভাবে চলব? কে ওদের বাবা বলে ডাকবে?”

চোখের পানি মুছতে মুছতে শাহেদের খালাতো ভাই মাসুম রানা বলেন, “বিমানবন্দরে নেমে ভাবির সঙ্গে কথা বলেছিল সাহেদ। তার কিছুক্ষণ পরই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সব শেষ হয়ে গেল। চোখের পলকে একটা হাসিখুশি পরিবার তছনছ হয়ে গেল।”

একইভাবে অশ্রুসজল চোখে শাহেদের চাচা লুৎফর রহমান বলেন, “সাহেদ খুবই শান্ত, ভদ্র ও পরিশ্রমী একটি ছেলে ছিল। পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করতেই সে প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করত। মাত্র কয়েক দিন আগে সে হাসিমুখে এখান থেকে বিদায় নিয়ে গেল। আমরা এই নির্মম সংবাদ কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি না। সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতায় অবশেষে তার দেহটা নিজ মাটিতে দাফন করতে পারলাম, এটাই শেষ শান্তি।”

উল্লেখ্য, শাহেদের পুরো পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাস জীবনের সাথে যুক্ত। তার বাবা রফিকুল ইসলাম বিগত প্রায় ৪০ বছর ধরে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। এমনকি তার মা ছাহেরা বেগমও ঘটনার দুই মাস আগে পবিত্র ওমরাহ পালনের জন্য সৌদিতে গিয়েছিলেন। ছেলে নিহতের ঘটনার সময়ও তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন। পরবর্তীতে ছেলের এমন মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক মৃত্যুর পর গভীর শোক নিয়ে চার দিন আগে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

বাবার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে শাহেদের দুই শিশু সন্তান কাওসার ও জিসানের কান্না থামানো যাচ্ছে না। অবুঝ এই দুটি শিশুর আকুল কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। সান্ত্বনা দিতে আসা প্রতিবেশী ও স্বজনরা অবুঝ সন্তানদের শান্ত করার কোনো ভাষাই খুঁজে পাচ্ছেন না। বাবা-মায়ের দূর পরবাস আর পরিবারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন স্বামীর এই আকস্মিক ও নির্মম চলে যাওয়া—সব মিলিয়ে এক বিশাল শোকের সাগরে ভেসে যাচ্ছে পুরো পরিবারটি। যে ঘরে দুদিন আগেও ছিল হাসিখুশি আর আনন্দের কলতান, সেখানে এখন শুধুই কান্না আর মাতমের রোল।
বগুড়া পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রুহুল কুদ্দুস দিলু বলেন, “ছুটি কাটিয়ে প্রবাসে ফিরেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ মৃত্যু পুরো এলাকাবাসীকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। আমরা শুরু থেকেই এই অসহায় পরিবারের পাশে আছি এবং যেকোনো প্রয়োজনে তাদের পাশে থাকব।”
অবশেষে শুক্রবার দুপুর আড়াইটায় মরদেহ গ্রামে পৌঁছানোর পর পারিবারিক আনুষ্ঠানিকতা ও জানাজা শেষে স্থানীয় গোরস্থানে শাহেদ আহম্মেদকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। উপার্জনক্ষম একমাত্র অভিভাবককে হারিয়ে এক গভীর অন্ধকার ও অনিশ্চয়তার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে এই নিষ্পাপ পরিবারটির ভবিষ্যৎ।

 

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category