‘মোবাইল সাংবাদিকতার মাধ্যমে আগামী প্রজন্মের গল্পকথক তৈরি’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) মোবাইল সাংবাদিকতা (MoJo) নিয়ে দিনব্যাপী একটি সমৃদ্ধ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে আধুনিক উপায়ে সংবাদ সংগ্রহ, প্রস্তুতকরণ ও উপস্থাপনের বিভিন্ন বাস্তবিক ও প্রাসঙ্গিক কৌশল শেখানো হয়।
‘ক্লাসরুম টু নিউজরুম: মোবাইল জার্নালিজম (MoJo) ট্রেনিং ওয়ার্কশপ অ্যান্ড স্ট্রিংগার ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক এ কর্মশালার যৌথ আয়োজক ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মুদ্রণ ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড’ (টিবিএস)।
বুধবার (৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে এই আয়োজন সম্পন্ন হয়। কর্মশালাটির বিশেষ আকর্ষণ ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর। নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন রাবির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হোসেন বকুল এবং দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের হেড অব মাল্টিমিডিয়া মজুমদার বাবু। মূলত এই সমঝোতা স্মারকের অংশ হিসেবেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে এ কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এর ফলে বিভাগের শিক্ষার্থীরা সরাসরি টিবিএসের সাথে কাজের সুযোগ পাবেন, পেশাদার নিউজরুমের সাথে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলতে পারবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে বসেই নিজেদের তৈরি সংবাদ ও বৈচিত্র্যময় কনটেন্ট প্রকাশের অনন্য সুযোগ পাবেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হোসেন বকুল। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত অধিকর্তা অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম। এছাড়াও অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কর্মশালা আয়োজনের আহ্বায়ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক মশিহুর রহমান এবং সহযোগী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন অধ্যাপক মশিহুর রহমান। এরপর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য তুলে ধরেন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মাল্টিমিডিয়া প্রধান মজুমদার বাবু। ‘ক্লাসরুম টু নিউজরুম’ প্রকল্পের মূল ধারণা ও উদ্দেশ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং কর্মশালার লিড ট্রেইনার রাজীব নন্দী।
কর্মশালার মূল সেশনগুলো যৌথভাবে পরিচালনা করেন মজুমদার বাবু ও অধ্যাপক রাজীব নন্দী। সেশনের পাশাপাশি টিবিএসের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দুই শিক্ষার্থী ইরফান ও এসআর শাওন মোবাইল সাংবাদিকতার নানা প্রায়োগিক দিকের ওপর পৃথক প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। আয়োজনে বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষ থেকে এমএসএস প্রথম সেমিস্টারের মোট ৫৭ জন প্রশিক্ষণার্থী শিক্ষার্থী সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক মশিহুর রহমান একাডেমিক শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের সংযোগ তুলে ধরে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা সাংবাদিকতার একাডেমিক তত্ত্ব জানলেও বাস্তবে তা কোথায় এবং কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সেখানে একটি বড় গ্যাপ থেকে যায়। একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির যৌথ সহযোগিতাই পারে এই দূরত্ব দূর করতে। এই উদ্যোগের ফলে শিক্ষার্থীরা কেবল প্রশিক্ষণে সীমাবদ্ধ না থেকে মাস্টারক্লাস, লেকচার, সেমিনার, যৌথ প্রজেক্ট ও ফিল্ড রিপোর্টিংয়ের মতো বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সরাসরি সুযোগ পাবেন।” তিনি শিক্ষার্থীদের এই কর্মশালাকে কেবল সাধারণ একটি প্রশিক্ষণ মনে না করে পেশাদার জগতের প্রবেশদ্বার হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের মাল্টিমিডিয়া প্রধান মজুমদার বাবু তাদের কর্মপরিকল্পনা ব্যক্ত করে বলেন, “আমাদের একটি বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে—‘কানেক্টিং টু দ্য নিউজরুম’। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করেই টিবিএসের সাথে কাজ করতে পারবেন। এর ফলে নিউজরুমের কর্মপরিবেশ এবং কাজের ধারা সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা আগেভাগেই স্পষ্ট ধারণা পাবেন; ঢাকার নিউজরুমগুলোতে গিয়ে আর বাড়তি ঘোরাঘুরি করতে হবে না।” তিনি আরও যুক্ত করেন, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা চলাকালীনই টিবিএসের জন্য রিপোর্ট পাঠাতে পারবেন যা পেশাদার নিউজরুমে মূল্যায়ন শেষে প্রকাশ করা হবে এবং কাজের বিনিময়ে সম্মানীয় ভাতাও প্রদান করা হবে। এটি শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবস্থাতেই প্রাতিষ্ঠানিক কাজের অভিজ্ঞতা দেবে।
কর্মশালার লিড ট্রেইনার রাজীব নন্দী আধুনিক সাংবাদিকতার পরিধি ব্যাখ্যা করে বলেন, “মোবাইল সাংবাদিকতা কেবল মোবাইল সেট ব্যবহারে সীমাবদ্ধ নয়; বহনযোগ্য যেকোনো আধুনিক ও সহজলভ্য ডিভাইস যেমন, ড্রোন, ডিএসএলআর কিংবা পোর্টেবল ক্যামেরা ব্যবহার করে সংবাদ তৈরি করাও এর অংশ। তবে সহজলভ্যতা ও দ্রুততার কারণে মোবাইল ফোন এখন সাংবাদিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।” তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, “সময়ের সাথে সাথে গল্প বলার ধরণ ও ডিভাইস পরিবর্তন হলেও সংবাদের মূল নির্যাস বা ‘গল্প বলা’র মূল উপাদান একই থাকে।” প্রযুক্তি গ্রহণের পাশাপাশি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি, বস্তুনিষ্ঠতা ও নৈতিকতা বজায় রেখে দায়িত্বশীল কনটেন্ট তৈরির ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আলিম অতীত ও বর্তমানের তথ্যের সহজলভ্যতার তুলনা টেনে বলেন, “একসময় শিক্ষার্থীদের খবরের জন্য প্রচণ্ড কষ্ট করতে হতো। বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে গিয়ে পেপার পড়তে হতো এবং প্রয়োজনীয় তথ্য নোটবুকে লিখে রাখতে হতো। আর এখন হাতের মোবাইলে এক ক্লিকেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত খবর চোখের সামনে চলে আসছে। প্রযুক্তির এই সুবাতাস শিক্ষার্থীদের তথ্যপ্রাপ্তি বহুগুণ সহজ করে দিয়েছে। টিবিএসের সাথে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এই সমঝোতা শিক্ষার্থীদের পেশাদার অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বাড়তি শক্তি যোগাবে।”
সমাপনী সভাপতির বক্তব্যে বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোজাম্মেল হোসেন বকুল প্রযুক্তির বিবর্তনে সাংবাদিকতার রূপান্তর তুলে ধরে বলেন, “কম্পিউটার কম্পোজ থেকে শুরু করে সফটওয়্যারনির্ভর এডিটিং, টেলিভিশন, অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়ার পর মোবাইল ফোন এখন সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। তাই কেবল দৃশ্যধারণ কিংবা ভিডিও করলেই চলবে না, মোবাইলের মাধ্যমে সাংবাদিকতার সূক্ষ্ম কারিগরি ও নীতিগত দিকগুলো নিখুঁতভাবে শিখতে হবে।” টিবিএসের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি যোগ করেন, একাডেমিয়া ও ইন্ডাস্ট্রির এই সংযোগ সরাসরি শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বীয় শিক্ষার সাথে প্র্যাকটিক্যাল ফিল্ডের ব্যবধান কমিয়ে আনবে।
অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত প্রাণবন্তভাবে সঞ্চালনা করেন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আবু সালেহ শোয়েব। সমগ্র আয়োজনের সার্বিক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সহযোগিতায় দায়িত্ব পালন করেন বিভাগের শিক্ষার্থী কে এম সিদ্দিক, তাসিন সিদ্দিকা রূপা ও প্রান্ত কুমার দাশ।